ওয়েবসাইট স্পিড: নিজেই চেক করুন, সাইট ধীর কেন আর কী করবেন

লিখেছেন সন্দীপন দাস · ৬ মিনিটে পড়ুন · আপডেট:

ওয়েবসাইট স্পিড — মোবাইলে PageSpeed Insights-এর রিপোর্ট আর স্পিডোমিটার

ওয়েবসাইট স্পিড নিজেই চেক করতে, মানে website speed test করতে, Google-এর ফ্রি টুল PageSpeed Insights খুলে সাইটের লিংক দিন — এক-দুই মিনিটে রিপোর্ট পাবেন। বেশিরভাগ ব্যবসার সাইট স্লো হয় তিনটে কারণে: বড় ছবি, স্লো হোস্টিং, আর অদরকারি প্লাগইন বা স্ক্রিপ্ট। এগুলো ঠিক করলেই মোবাইলে সাইট অনেক তাড়াতাড়ি খোলে।

এই লেখাটা উল্টো দিক থেকে শুরু করছি — আগে টেস্ট, তারপর রিপোর্ট বোঝা, তারপর কারণ আর সলিউশন।

আগে টেস্টটা করে ফেলুন (৫ মিনিট)

পড়া পরে, আগে হাতে-কলমে দেখে নিন আপনার সাইট কোথায় দাঁড়িয়ে:

  1. মোবাইল বা কম্পিউটারে খুলুন PageSpeed Insights।
  2. বক্সে আপনার সাইটের পুরো লিংক দিন (যেমন https://আপনার-সাইট.com) আর "Analyze" টিপুন।
  3. রিপোর্ট এলে উপরে Mobile ট্যাবটা দেখুন। কাস্টমার বেশিরভাগ মোবাইলেই আসেন।
  4. শুধু হোম পেজ নয় — সবচেয়ে বেশি দেখা হয় এমন একটা সার্ভিস বা প্রোডাক্ট পেজও টেস্ট করুন।
  5. রিপোর্টের একটা স্ক্রিনশট রেখে দিন। পরে চেঞ্জের আগে-পরে মেলাতে কাজে লাগবে।

আর একটা টেস্ট, যেটা কোনো টুল দিয়ে হয় না: নিজের ফোনে মোবাইল ডেটা চালু করে (Wi-Fi বন্ধ রেখে) সাইটটা খুলুন। কাস্টমারের চোখে দেখুন — কত সেকেন্ডে লেখা দেখা গেল, বাটন টেপা গেল কিনা।

PageSpeed Insights-এর রিপোর্ট কিভাবে পড়বেন

রিপোর্টে দুটো আলাদা অংশ থাকে। এটা না বুঝলে অনেকে গুলিয়ে ফেলেন।

উপরের অংশ: আসল কাস্টমারদের এক্সপেরিয়েন্স

এখানে লেখা থাকে "Discover what your real users are experiencing"। এটা Chrome ইউজারদের আসল ডেটা থেকে আসে — গত ২৮ দিনে লোকে আপনার সাইট খুলে কেমন এক্সপেরিয়েন্স পেয়েছেন।

সাইটে ভিজিটর কম হলে এখানে "No data" দেখাতে পারে। ভয় পাবেন না, অনেক ব্যবসার সাইটেই এটা হয়। তখন নিচের অংশটা দেখুন।

নিচের অংশ: ল্যাব টেস্ট আর স্কোর

এখানে ০ থেকে ১০০-র একটা স্কোর থাকে, সঙ্গে সবুজ, কমলা বা লাল রং। এটা Google একবার আপনার সাইট খুলে মেপে দেখেছে। বারবার চালালে স্কোর একটু ওঠানামা করে — এটা স্বাভাবিক।

একদম নিচে "Diagnostics" অংশে বলা থাকে কী কী ঠিক করলে সাইট তাড়াতাড়ি হবে। এই অংশটাই আপনার বা আপনার ডেভেলপারের কাজের লিস্ট।

Core Web Vitals: তিনটে মাপ, সহজ কথায়

Google সাইটের স্পিড আর ইউজার এক্সপেরিয়েন্স মাপতে তিনটে জিনিস দেখে। এদের একসঙ্গে বলে Core Web Vitals।

মাপপুরো নামকী মাপেরোজকার ভাষায়Google-এর "Good"
LCPLargest Contentful Paintপেজের সবচেয়ে বড় জিনিসটা (মেন ছবি বা হেডিং) দেখা যেতে কত সময়"সাইটটা খুলল কখন?"২.৫ সেকেন্ড বা তার কম
INPInteraction to Next Paintবাটন টিপলে বা মেনু খুললে সাইট কত তাড়াতাড়ি সাড়া দেয়"টিপলাম, কাজ হল কি?"২০০ মিলিসেকেন্ড বা তার কম
CLSCumulative Layout Shiftপেজ খোলার সময় লেখা বা বাটন হঠাৎ সরে যায় কিনা"টিপতে গেলাম, বাটন সরে গেল!"০.১ বা তার কম

শেষেরটা সবাই চেনেন। ফোন নম্বরে টিপতে গেলেন, ঠিক তখনই উপরে একটা ছবি লোড হল, সব নিচে নেমে গেল — আর আপনি টিপে ফেললেন একটা অ্যাডে। এটাই খারাপ CLS।

Google-এর Core Web Vitals নিয়ে পেজে Google নিজেই বলেছে, ভালো Core Web Vitals সার্চে হেল্প করে, কিন্তু শুধু এটা দিয়ে র‍্যাঙ্ক হয় না। লেখা কতটা কাজের, সেটাই আগে। তবে স্লো সাইটের আসল ক্ষতিটা হয় কাস্টমারের ধৈর্যে।

সাইট স্লো হওয়ার কমন কারণ আর সলিউশন

১. বড় বড় ছবি

সবচেয়ে কমন কারণ। মোবাইলে তোলা ছবি সোজা সাইটে তুলে দিলে একেকটা ছবি অনেক বড় হয়। মোবাইলের ছোট স্ক্রিনে অত বড় ছবির দরকারই নেই।

কী করবেন: তোলার আগে ছবি ছোট করুন (চওড়ায় মোটামুটি ১২০০–১৬০০ পিক্সেল যথেষ্ট)। WebP ফরম্যাট ব্যবহার করুন। WordPress-এ ছবি ছোট করার প্লাগইন কাজে আসে। নিজে কিভাবে ছবি চেঞ্জ করবেন, লিখেছি ডেভেলপার ছাড়াই সাইট আপডেট করার লেখায়।

২. স্লো বা ভিড়ে ঠাসা হোস্টিং

আপনার সাইট যে সার্ভারে থাকে, সেটা স্লো হলে বাকি সব ঠিক থাকলেও সাইট দেরিতে খোলে। খুব সস্তা শেয়ার্ড হোস্টিংয়ে এক সার্ভারে অনেক সাইট গাদাগাদি করে থাকে, তাই সাইট স্লো হয়ে যায়।

কী করবেন: রিপোর্টে সার্ভার রেসপন্স স্লো বলে ওয়ার্নিং (server response time বা document request latency) দেখলে হোস্টিং দায়ী হতে পারে। ক্যাশিং চালু করুন, আর CDN (যেমন Cloudflare) ব্যবহার করার কথা ভাবুন। তাতেও না হলে ভালো হোস্টিংয়ে সরানো ছাড়া উপায় থাকে না। সেক্ষেত্রে dronahost.com দেখে নিতে পারেন — AWS, Google Cloud আর DigitalOcean-এর সার্ভারে চলা ক্লাউড আর WordPress হোস্টিং, আর পুরনো হোস্টিং থেকে সাইট সরিয়ে দেওয়াটা ফ্রি।

৩. অনেক প্লাগইন আর স্ক্রিপ্ট

চ্যাট উইজেট, স্লাইডার, পপ-আপ, তিন-চারটে ট্র্যাকিং কোড, সোশ্যাল মিডিয়া ফিড — প্রতিটা একটু একটু করে সাইট ভারী করে। বিশেষ করে INP খারাপ হয়।

কী করবেন: প্রতিটা প্লাগইনকে জিজ্ঞেস করুন — "তুমি কি কাস্টমার আনছ?" না হলে সরিয়ে দিন। একটা WhatsApp বাটন অনেক সময় একটা ভারী চ্যাট উইজেটের চেয়ে বেশি কাজের।

৪. ভারী থিম বা পেজ বিল্ডার

কিছু থিম আর পেজ বিল্ডার দেখতে সুন্দর, কিন্তু প্রতিটা পেজে অনেক কোড লোড করে — যার বেশিরভাগ ওই পেজে লাগেই না।

কী করবেন: নতুন সাইট হলে হালকা থিম বাছুন। পুরনো সাইটে পুরো থিম চেঞ্জ করা বড় কাজ — ডেভেলপারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করুন।

৫. হোম পেজে বড় ভিডিও বা স্লাইডার

উপরের বিরাট স্লাইডার আর অটো-প্লে ভিডিও সাধারণত LCP খারাপ করে।

কী করবেন: একটা ভালো ছবি আর পরিষ্কার এক লাইন অনেক বেশি কাজ দেয়। ভিডিও রাখতে চাইলে YouTube-এ তুলে লিংক বা ছোট প্রিভিউ দিন।

৬. সাইজ ছাড়া ছবি আর অ্যাড

ছবি বা বক্সের জায়গা আগে থেকে ঠিক না থাকলে লোড হওয়ার সময় সব নড়ে যায় — CLS খারাপ হয়।

কী করবেন: ছবির চওড়া-উচ্চতা ঠিক করে দেওয়া, আর উপরে হঠাৎ ব্যানার না ঢোকানো। এটা সাধারণত ডেভেলপারের কাজ।

ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: স্কোর ১০০ করার পেছনে দৌড়বেন না। আমি দেখি, সাইটের মালিক একটা স্পিড প্লাগইনের পর আরেকটা বসাচ্ছেন, শেষে সাইটই ভেঙে যাচ্ছে। তার চেয়ে ছবি ছোট করা, অদরকারি প্লাগইন সরানো আর ভালো হোস্টিং — এই তিনটে কাজ করলেই বেশিরভাগ সাইট মোবাইলে দিব্যি তাড়াতাড়ি খোলে।

স্পিড ঠিক করার আগে একটা জরুরি কথা

যে কোনো বড় চেঞ্জের আগে — প্লাগইন সরানো, থিম চেঞ্জ, হোস্টিং সরানো — পুরো সাইটের ব্যাকআপ নিন। কিছু ভুল হলে যেন আগের অবস্থায় ফিরতে পারেন। কিভাবে ব্যাকআপ রাখবেন, লিখেছি ওয়েবসাইট ব্যাকআপ নিয়ে লেখায়।

ওয়েবসাইট স্পিড ঠিক রাখার মাসিক চেকলিস্ট

স্পিড একবার ঠিক করলেই শেষ নয়। নতুন ছবি, নতুন প্লাগইন আসতেই থাকে। মাসে একবার এগুলো দেখুন:

  • PageSpeed Insights-এ হোম পেজ আর একটা মেন পেজ টেস্ট করুন, আগের স্ক্রিনশটের সঙ্গে মেলান।
  • গত মাসে তোলা নতুন ছবিগুলো ছোট করা হয়েছিল কিনা দেখুন।
  • নতুন কোনো প্লাগইন বসেছে কিনা — সত্যিই দরকার কিনা।
  • নিজের ফোনে মোবাইল ডেটায় সাইট খুলে দেখুন।
  • Google Search Console থাকলে সেখানে "Core Web Vitals" রিপোর্টে কোনো পেজ লাল হয়েছে কিনা দেখুন।

মাসিক বাকি কাজগুলোর লিস্ট পাবেন ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্সের মাসিক চেকলিস্টে। আর সাইট দেখভালের পুরো ছবিটা আছে ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্সের গাইডে।

শেষ কথা

ওয়েবসাইট স্পিড আসলে কাস্টমারের সময়ের প্রতি রেসপেক্ট। দোকানের দরজা আটকে থাকলে যেমন লোকে পাশের দোকানে চলে যান, সাইট না খুললেও তাই হয়। ভালো খবর হল — বেশিরভাগ স্লো সাইট কয়েকটা সোজা কাজেই অনেকটা ঠিক হয়ে যায়।

নিজে এসব সামলাতে না চাইলে সাইটের দেখভালের দায়িত্ব আমাকে দিতে পারেন। আমার সার্ভিস দেখুন, অথবা যোগাযোগ করুন — WhatsApp-এ সাইটের লিংক পাঠালে স্পিড চেক করে বলে দেব কোথায় আটকাচ্ছে।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

PageSpeed Insights-এ ১০০ না পেলে কি প্রবলেম?

না। ১০০ স্কোর দরকার নেই। স্কোরটা ল্যাবে একবার চালানো টেস্টের হিসেব, বারবার চালালে একটু ওঠানামা করে। বেশি জরুরি হল আসল ইউজারদের Core Web Vitals 'Good' আছে কিনা, আর আপনার কাস্টমার নিজের ফোনে সাইটটা তাড়াতাড়ি খুলতে পারছেন কিনা।

সাইট তাড়াতাড়ি খুললেই কি Google-এ উপরে আসব?

শুধু স্পিড দিয়ে উপরে আসা যায় না। Google বলেছে ভালো Core Web Vitals হেল্প করে, কিন্তু লেখা কতটা কাজের আর সার্চের সঙ্গে কতটা মিলছে — সেটাই আগে দেখা হয়। তবে সাইট খুব স্লো হলে কাস্টমার অপেক্ষা না করে ফিরে যান, সেই ক্ষতিটা সরাসরি।

কম্পিউটারে তো সাইট ঠিক খোলে, মোবাইলে website speed কেন কম?

কম্পিউটারে সাধারণত নেট ভালো আর প্রসেসর জোরালো। মোবাইলে নেট ওঠানামা করে, ফোনের ক্ষমতাও কম। বড় ছবি, অনেক স্ক্রিপ্ট আর ভারী থিম মোবাইলেই বেশি টের পাওয়া যায়। তাই স্পিড সব সময় মোবাইলে চেক করুন।

স্পিড বাড়াতে কি প্লাগইন বসালেই হবে?

ক্যাশিং বা ছবি ছোট করার প্লাগইন কাজে আসে, কিন্তু সব প্রবলেম মেটায় না। স্লো হোস্টিং, ভারী থিম বা অনেক অদরকারি প্লাগইন থাকলে আগে সেগুলো ঠিক করতে হয়। আর অনেক স্পিড প্লাগইন একসঙ্গে বসালে উল্টে সাইট ভাঙতে পারে — বসানোর আগে ব্যাকআপ নিন।

সর্বশেষ আপডেট:

#Google #SEO #ওয়েবসাইট

WhatsApp