ওয়েবসাইট ব্যাকআপ: কেন, কতদিন অন্তর, আর কিভাবে ফেরত আনবেন

লিখেছেন সন্দীপন দাস · ৬ মিনিটে পড়ুন · আপডেট:

ওয়েবসাইট ব্যাকআপ — ল্যাপটপ থেকে ক্লাউডে সাইটের কপি সেভ হওয়ার ছবি

ওয়েবসাইট ব্যাকআপ (website backup) মানে আপনার পুরো সাইটের — লেখা, ছবি, সেটিংস, সবকিছুর — একটা কপি অন্য জায়গায় সেভ করে রাখা, যাতে সাইট খারাপ হলে বা হ্যাক হলে আগের অবস্থায় ফেরত আনা যায়। কতদিন অন্তর নেবেন, সেটা নির্ভর করে সাইট কত ঘন ঘন চেঞ্জ হয় তার উপর। আর ব্যাকআপ তখনই কাজের, যখন সেটা থেকে সত্যিই সাইট ফেরত আনা যায় — তাই মাঝে মাঝে সেটা চেক করাও দরকার।

এই লেখায় তিনটে প্রশ্নের সোজা উত্তর দিচ্ছি: কেন, কতদিন অন্তর, আর বিপদ হলে কিভাবে ফেরত আনবেন।

একটা সোমবার সকালের কথা ভাবুন

ধরুন, আপনার একটা ক্লিনিক বা দোকানের ওয়েবসাইট আছে। সোমবার সকালে একজন কাস্টমার WhatsApp করলেন, "আপনাদের সাইট খুললে অদ্ভুত একটা পেজ আসছে।" আপনি খুলে দেখলেন, সত্যিই তাই। হয়তো কোনো প্লাগিন আপডেটে গোলমাল, হয়তো হ্যাক।

এবার দুটো রাস্তা। ব্যাকআপ থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আগের দিনের সাইট ফেরত। ব্যাকআপ না থাকলে — হয়তো দিনের পর দিন সাইট বন্ধ, আর অনেক কিছু নতুন করে বানাতে হতে পারে।

এই দুই অবস্থার মধ্যে ডিফারেন্স শুধু একটাই — আগে থেকে একটা কপি রাখা ছিল কিনা।

ওয়েবসাইট ব্যাকআপ কেন দরকার

সাইট খারাপ হওয়ার কারণ অনেক, আর বেশিরভাগই আগে থেকে বোঝা যায় না:

  • আপডেটে গোলমাল — থিম বা প্লাগিন আপডেটের পর সাইট ভেঙে যেতে পারে।
  • হ্যাক বা ম্যালওয়্যার — পুরনো প্লাগিন বা দুর্বল পাসওয়ার্ড দিয়ে কেউ ঢুকে পড়লে।
  • নিজের হাতের ভুল — ভুল করে একটা পেজ ডিলিট, বা সেটিংস চেঞ্জ করে সব এলোমেলো।
  • সার্ভারের প্রবলেম — হোস্টিংয়ে হার্ডওয়্যার খারাপ বা অন্য কোনো বড় গোলমাল।
  • হোস্টিং চেঞ্জ করা — নতুন জায়গায় সাইট সরাতে গেলেও একটা পরিষ্কার ব্যাকআপ লাগে।

সাইটে যত কাজ জমে — লেখা, ছবি, কাস্টমারের এনকোয়ারি, অর্ডার — হারালে লসও তত বেশি। ব্যাকআপ অনেকটা দোকানের ইনশিওরেন্সের মতো। দরকার না পড়াই ভালো, কিন্তু পড়লে ওটাই বাঁচায়।

ব্যাকআপে কী কী থাকতে হবে

WordPress-এর মতো বেশিরভাগ সাইটের দুটো অংশ:

  1. ফাইল — থিম, প্লাগিন, আপলোড করা ছবি আর ডকুমেন্ট, কনফিগারেশন ফাইল।
  2. ডেটাবেস — সব পেজ আর পোস্টের লেখা, মেনু, সেটিংস, ইউজার, অর্ডার বা ফর্মের এন্ট্রি।

দুটো একসঙ্গে না থাকলে সাইট পুরোটা ফেরত আসে না। শুধু ছবির ফোল্ডার কপি করে রাখলে ব্যাকআপ হয় না। WordPress-এর নিজের হ্যান্ডবুকেও ব্যাকআপে কী কী রাখতে হয় সেটা আলাদা করে বলা আছে।

এর বাইরে সাইটের লগইন ডিটেলস (হোস্টিং, ডোমেইন, WordPress অ্যাডমিন) কোথায় আছে, সেটাও লিখে সেফ জায়গায় রাখুন। ব্যাকআপ থাকলেও হোস্টিংয়ে ঢুকতে না পারলে ফেরত আনবেন কিভাবে?

কতদিন অন্তর ব্যাকআপ নেবেন

সোজা নিয়ম: শেষ ব্যাকআপের পর যতটা কাজ হারালে আপনার গায়ে লাগবে, তার আগেই পরের ব্যাকআপ নিন।

আপনার সাইট কেমনকতদিন অন্তর
অনলাইন অর্ডার, বুকিং বা রোজ ফর্ম জমা পড়েরোজ (দরকার হলে দিনে একাধিকবার)
সপ্তাহে কয়েকবার নতুন লেখা বা ছবি যোগ হয়রোজ বা কয়েক দিন অন্তর
মাসে এক-দু'বার চেঞ্জ হয়সপ্তাহে একবার
প্রায় চেঞ্জ হয় না, কয়েক পেজের সাইটসপ্তাহে বা মাসে একবার

আর যে কোনো সাইটের জন্য একটা নিয়ম পাকা: বড় আপডেট বা বড় চেঞ্জের ঠিক আগে একটা ব্যাকআপ। থিম চেঞ্জ, WordPress আপডেট, নতুন প্লাগিন — সবকিছুর আগে।

কোথায় রাখবেন: এক জায়গায় নয়

সবচেয়ে বড় ভুল হল সাইট আর ব্যাকআপ একই সার্ভারে রাখা। সার্ভারে গোলমাল হলে দুটোই একসঙ্গে যায়।

অনেক ডেভেলপার একটা সহজ নিয়ম মানেন, যাকে বলে ৩-২-১:

  • ৩টে কপি — আসল সাইট আর অন্তত দুটো ব্যাকআপ।
  • ২ রকম জায়গায় — যেমন একটা ক্লাউড স্টোরেজে, একটা কম্পিউটার বা এক্সটার্নাল ড্রাইভে।
  • ১টা সার্ভারের বাইরে — হোস্টিংয়ের বাইরে অন্তত একটা কপি।

সব ব্যবসার এতটা লাগে না, কিন্তু অন্তত একটা কপি হোস্টিংয়ের বাইরে রাখুন।

ব্যাকআপ টুল বা সার্ভিস বাছার সময় যা দেখবেন

কোনো একটা কোম্পানির নাম বলছি না, কারণ সাইট আর হোস্টিং অনুযায়ী ঠিক অপশনটা আলাদা হয়। তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর "হ্যাঁ" হওয়া চাই:

  • অটোমেটিক, সময় বেঁধে ব্যাকআপ হয় তো?
  • ফাইল আর ডেটাবেস দুটোই নেয়?
  • ব্যাকআপ সার্ভারের বাইরে, অন্য জায়গায় যায়?
  • কয়েক সপ্তাহের আলাদা আলাদা কপি রাখে?
  • ফেরত আনার উপায় সহজ, আর আপনি বা আপনার ডেভেলপার নিজেই করতে পারবেন?
  • ব্যাকআপ শেষ না হলে বা ফেল করলে ইমেলে জানায়?

ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: যে ব্যাকআপ থেকে কখনও ফেরত আনার চেষ্টা করা হয়নি, তাকে আমি পুরো ভরসা করি না। মাঝে মাঝে ফাইলটা খুলে দেখা, বা একটা টেস্ট জায়গায় রিস্টোর করে দেখা — এই অভ্যেসটাই বিপদের দিনে আসল কাজে দেয়।

সাইট খারাপ হলে কিভাবে ফেরত আনবেন (সাইট রিস্টোর)

বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখা সবচেয়ে জরুরি। এই স্টেপগুলো ধরে এগোন:

  1. আগে বুঝুন কী হয়েছে। শুধু একটা পেজ ভেঙেছে, না পুরো সাইট? হ্যাক মনে হচ্ছে, না আপডেটের গোলমাল? ছোট প্রবলেমে পুরো সাইট রিস্টোর না করে শুধু ওই প্লাগিন বন্ধ করলেই হতে পারে।
  2. এখনকার অবস্থারও একটা কপি নিন। খারাপ অবস্থাটাও ব্যাকআপ করে রাখুন। পরে কী হয়েছিল বুঝতে বা মাঝের কোনো ডেটা রিকভার করতে কাজে লাগে।
  3. ঠিক ব্যাকআপ বাছুন। প্রবলেম শুরুর আগের শেষ ভালো কপি। হ্যাক হলে একটু পুরনো, পরিষ্কার কপি বাছতে হতে পারে।
  4. ফাইল আর ডেটাবেস দুটোই ফেরত আনুন। টুল বা হোস্টিং প্যানেলের রিস্টোর অপশন দিয়ে, বা ডেভেলপারকে দিয়ে।
  5. সাইট ভালো করে চেক করুন। হোম পেজ, যোগাযোগ ফর্ম, WhatsApp বাটন, মোবাইলে খোলা — সব।
  6. হ্যাক হলে দরজা বন্ধ করুন। সব পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করুন, WordPress, থিম, প্লাগিন আপডেট করুন, অচেনা অ্যাডমিন ইউজার থাকলে সরান। নইলে একই রাস্তা দিয়ে আবার ঢুকবে।
  7. মাঝের ডেটা মিলিয়ে নিন। ব্যাকআপের পর যে অর্ডার বা এনকোয়ারি এসেছিল, সেগুলো ইমেল বা WhatsApp থেকে খুঁজে মিলিয়ে নিন।

ব্যাকআপ নিয়ে কয়েকটা কমন ভুল

এগুলো প্রায়ই চোখে পড়ে, আর বিপদের দিনেই ধরা পড়ে:

  • "ডেভেলপারের কাছে আছে" ভেবে নিশ্চিন্ত থাকা। ডেভেলপার চেঞ্জ করলে বা যোগাযোগ না থাকলে সেই কপি আপনার কাজে আসবে না। অন্তত একটা কপি আপনার নিজের অ্যাকাউন্টে রাখুন।
  • ব্যাকআপ প্লাগিন বসিয়ে ভুলে যাওয়া। মাসের পর মাস ব্যাকআপ ফেল করছে, কেউ জানেই না।
  • পাসওয়ার্ড ছাড়া ব্যাকআপ ফাইল যেখানে সেখানে রাখা। ব্যাকআপে কাস্টমারের নাম, ফোন, ইমেলও থাকতে পারে। তাই ফাইল সেফ জায়গায় রাখুন, যার-তার সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
  • ইমেল ভুলে যাওয়া। ব্যবসার ইমেল যদি হোস্টিংয়েই থাকে, সেটার ব্যাকআপ আলাদা ব্যাপার। সাইটের ব্যাকআপে সাধারণত ইমেল থাকে না।

একবার সেটআপ, তারপর মাসিক চেক

ব্যাকআপ একবার ঠিকঠাক সেটআপ করে ফেললে রোজ ভাবতে হয় না। শুধু মাসে একবার এই কয়েকটা জিনিস দেখুন:

  • শেষ ব্যাকআপ কবে হয়েছে, ঠিকমতো শেষ হয়েছে কিনা।
  • সার্ভারের বাইরের কপিটা আছে তো।
  • পুরনো কপি জমে স্টোরেজ ভরে যাচ্ছে না তো।
  • কয়েক মাসে একবার টেস্ট রিস্টোর।

এই চেকটা ওয়েবসাইটের মাসিক চেকলিস্টের মধ্যেই জুড়ে নিতে পারেন। আর সাইটের দেখভাল নিয়ে পুরো ছবিটা পাবেন ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্সের গাইডে।

নিজে সাইটে লেখা বা ছবি চেঞ্জ করেন? তাহলে বড় কিছু চেঞ্জের আগে ব্যাকআপ নেওয়ার অভ্যেস করুন। কোন কাজ নিজে নিরাপদে করা যায়, লিখেছি নিজে ওয়েবসাইট এডিট করার লেখায়।

শেষ কথা

ওয়েবসাইট ব্যাকআপের কথা কেউ ভাবেন না, যতদিন না সাইট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। তখন আর কিছু করার থাকে না। আজ পাঁচ মিনিট দিয়ে দেখে নিন — আপনার সাইটের শেষ ব্যাকআপ কবে হয়েছে, আর সেটা কোথায় আছে। উত্তর না জানলে সেটাই প্রথম কাজ।

এসব নিজে সামলাতে না চাইলে সাইটের মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব আমাকে দিন। কী কী করি, দেখুন সার্ভিস পেজে, আর যোগাযোগ করুন — সাইটের লিংক WhatsApp করুন।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

হোস্টিং কোম্পানি তো ব্যাকআপ রাখে বলে, তাহলে আলাদা করে লাগবে কেন?

হোস্টিংয়ের ব্যাকআপ থাকলে ভালো, কিন্তু ওটার উপর পুরো ভরসা করবেন না। অনেক সময় ওই ব্যাকআপ একই সার্ভারে থাকে, অল্প কয়েক দিনের থাকে, বা ফেরত আনতে সাপোর্টকে বলতে হয়। সার্ভারে বড় প্রবলেম হলে বা অ্যাকাউন্ট নিয়ে ঝামেলা হলে সাইট আর ব্যাকআপ একসঙ্গে আটকে যেতে পারে। তাই নিজের হাতে, অন্য জায়গায় একটা কপি রাখা দরকার।

ব্যাকআপ ফাইল কতদিন রেখে দেব?

শুধু শেষ ব্যাকআপটা রাখলে বিপদ। ধরুন সাইটে ভাইরাস ঢুকেছে দশ দিন আগে, আপনি টের পেলেন আজ — তাহলে শেষ কয়েকটা ব্যাকআপেও ভাইরাস আছে। তাই অন্তত কয়েক সপ্তাহের আলাদা আলাদা কপি রাখুন, আর বড় আপডেটের আগের কপিগুলো আরও বেশিদিন।

Website backup নিলে কি সাইট স্লো হয়ে যায়?

বড় সাইটে ব্যাকআপ চলার সময় সার্ভারের উপর একটু চাপ পড়তে পারে। তাই অটো ব্যাকআপ রাতের দিকে রাখুন, যখন ভিজিটর কম। সাধারণ ব্যবসার সাইটে এটা সাধারণত টেরই পাওয়া যায় না।

শুধু ফাইল কপি করলেই কি পুরো সাইটের ব্যাকআপ হয়ে যায়?

WordPress-এর মতো সাইটে না। ছবি, থিম, প্লাগিন থাকে ফাইলে, কিন্তু লেখা, পেজ, সেটিংস, অর্ডার — এগুলো থাকে ডেটাবেসে। দুটোর একটা না থাকলে সাইট পুরো ফেরত আসবে না।

সর্বশেষ আপডেট:

#SEO #ওয়েবসাইট

WhatsApp