ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্স চেকলিস্ট: মাসে ৩০ মিনিটে যা যা দেখবেন

লিখেছেন সন্দীপন দাস · ৬ মিনিটে পড়ুন · আপডেট:

ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্স চেকলিস্ট — ল্যাপটপের পাশে টিক দেওয়া মাসিক চেকলিস্ট আর ঘড়ি

ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্স চেকলিস্ট (website maintenance checklist) মানে মাসে একবার বসে কয়েকটা জিনিস মিলিয়ে দেখা — সাইট খুলছে কিনা, কাস্টমার যোগাযোগ করতে পারছেন কিনা, ডিটেলস ঠিক আছে কিনা, আর সাইট সেফ আছে কিনা। পুরো কাজটা আধ ঘণ্টায় হয়ে যায়, কোনো টেকনিক্যাল জ্ঞান লাগে না। নিচে আগে পুরো লিস্টটা দিলাম, তারপর প্রতিটা স্টেপ কিভাবে করবেন।

মাসের একটা দিন ঠিক করে নিন — ধরুন প্রতি মাসের প্রথম রবিবার সকাল। ফোনে রিমাইন্ডার দিয়ে রাখুন।

৩০ মিনিটের ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্স চেকলিস্ট

#কী দেখবেনকতক্ষণ
১মোবাইল ডেটায় সাইট খুলছে কিনা, সব পেজ ঠিক দেখাচ্ছে কিনা৩ মিনিট
২ফোন, WhatsApp বাটন আর এনকোয়ারি ফর্ম কাজ করছে কিনা৫ মিনিট
৩দোকানের সময়, ছুটি, অফার, ঠিকানা — সব ডিটেলস আপডেট কিনা৫ মিনিট
৪ব্যাকআপ নেওয়া হচ্ছে কিনা৩ মিনিট
৫প্লাগইন, থিম আর সফটওয়্যার আপডেট৫ মিনিট
৬সাইটের স্পিড৩ মিনিট
৭Google Search Console-এ কোনো প্রবলেম দেখাচ্ছে কিনা৪ মিনিট
৮ডোমেইন আর হোস্টিং রিনিউর তারিখ২ মিনিট

এবার একটা একটা করে দেখি।

ধাপ ১: কাস্টমারের চোখে সাইটটা খুলুন

Wi-Fi বন্ধ করে, মোবাইল ডেটায় নিজের সাইট খুলুন। আপনার বেশিরভাগ কাস্টমার এভাবেই দেখেন।

  • হোম পেজ কি তাড়াতাড়ি খুলছে?
  • মেনু টিপলে সব পেজে যাওয়া যাচ্ছে?
  • কোনো ছবি ভাঙা দেখাচ্ছে না তো?
  • কোনো লেখা স্ক্রিনের বাইরে চলে যাচ্ছে না তো?

ধরুন, কলকাতার একটা কোচিং সেন্টারের সাইটে নতুন ব্যাচের একটা বড় ব্যানার বসানো হয়েছে। কম্পিউটারে দারুণ দেখাচ্ছে, কিন্তু মোবাইলে ব্যানারের লেখা কেটে গেছে। মালিক নিজের ফোনে কখনও খুলে দেখেননি, তাই জানতেই পারেননি। এই চেকটা ঠিক এরকম জিনিস ধরার জন্য।

ধাপ ২: যোগাযোগের রাস্তাগুলো টেস্ট করুন

সাইটের আসল কাজ কাস্টমারকে আপনার সঙ্গে কথা বলানো। তাই এটা সবচেয়ে দরকারি চেক।

  1. সাইট থেকে ফোন নম্বরে টিপুন — ঠিক নম্বরে কল যাচ্ছে?
  2. WhatsApp বাটন টিপুন — ঠিক নম্বরে চ্যাট খুলছে?
  3. এনকোয়ারি ফর্মে নিজের নাম দিয়ে একটা টেস্ট মেসেজ পাঠান — ইমেল বা WhatsApp-এ পৌঁছল?

ফর্মের মেসেজ না পৌঁছনো খুব কমন প্রবলেম, আর মালিক অনেক সময় মাসের পর মাস টের পান না। কাস্টমার ভাবেন আপনি উত্তর দিচ্ছেন না, আপনি ভাবেন কেউ ফর্ম ভরছে না।

ধাপ ৩: তথ্যগুলো মিলিয়ে নিন

পুরনো ইনফো দেখে কাস্টমার এসে দোকান বন্ধ পেলে, সেটা খুব খারাপ ছাপ ফেলে। মিলিয়ে দেখুন:

  • দোকান বা অফিসের সময়, আর সামনের ছুটির দিন
  • কোনো অফার বা নোটিস, যেটা এক্সপায়ার হয়ে গেছে
  • নতুন সার্ভিস বা জিনিস, যেটা সাইটে এখনও নেই
  • ফোন নম্বর, ঠিকানা — Google প্রোফাইল আর ফেসবুকের সঙ্গে হুবহু এক কিনা

পুজো, দোল বা ভোটের দিনের মতো সময়ে আগে থেকে সাইটে ছুটির কথা লিখে দিন।

ধাপ ৪: ব্যাকআপ চেক করুন

ব্যাকআপ মানে সাইটের পুরো একটা কপি, যেটা থেকে কিছু খারাপ হলে সাইট আগের অবস্থায় ফেরানো যায়। শুধু "ব্যাকআপ চালু আছে" ভাবলে হবে না, দেখুন:

  • শেষ ব্যাকআপ কবে হয়েছে?
  • ব্যাকআপটা সাইটের সার্ভারের বাইরে অন্য কোথাও রাখা আছে কিনা (যেমন Google Drive বা অন্য কোনো স্টোরেজ)?
  • দরকার পড়লে কে ব্যাকআপ থেকে সাইট ফেরাবেন, সেটা জানা আছে কিনা?

সার্ভারেই একমাত্র ব্যাকআপ থাকলে, সার্ভারে প্রবলেম হলে ব্যাকআপও যায়। এটা মাথায় রাখবেন।

ধাপ ৫: আপডেট দিন, কিন্তু সাবধানে

WordPress বা যে কোনো সফটওয়্যারে চলা সাইটে নিয়মিত আপডেট আসে। অনেক আপডেটে সিকিউরিটির ফাঁক বন্ধ করা হয়, তাই ফেলে রাখা ঠিক নয়।

নিয়মটা সহজ:

  1. আগে ব্যাকআপ নিন।
  2. একটা একটা করে প্লাগইন আপডেট দিন, সব একসঙ্গে নয়।
  3. প্রতিটার পরে সাইটটা একবার খুলে দেখুন।
  4. যে প্লাগইন আর কাজে লাগে না, সেটা ডিঅ্যাক্টিভেট না রেখে পুরো সরিয়ে দিন।

থিম বা WordPress-এর বড় আপডেট এলে, নিজে না করে যিনি সাইট বানিয়েছেন তাঁকে দিয়ে করানো ভালো।

ধাপ ৬: স্পিড দেখুন

Google-এর ফ্রি টুল PageSpeed Insights-এ সাইটের লিংক দিয়ে চেক করুন। মোবাইলের রিপোর্টটাই আগে দেখুন।

নম্বর নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেন না। আসল কথা হল আগের মাসের চেয়ে খারাপ হয়েছে কিনা। হঠাৎ অনেক খারাপ হলে খুঁজে দেখুন এর মধ্যে কী চেঞ্জ হয়েছে — নতুন বড় ছবি, নতুন প্লাগইন, নতুন ভিডিও?

ধাপ ৭: Google Search Console একবার খুলুন

Search Console হল Google-এর ফ্রি টুল, যেটা দেখায় Google আপনার সাইট কিভাবে দেখছে (Google-এর হেল্প পেজ)। মাসে একবার শুধু এই দুটো দেখুন:

  • Performance — কতজন Google থেকে সাইটে এলেন, কোন কোন সার্চে। আগের মাসের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
  • Pages — আপনার দরকারি পেজগুলো Google-এ আছে কিনা। হোম, সার্ভিস আর কনট্যাক্ট পেজ বাদ পড়লে চিন্তার কথা।

Search Console-এ সাইট জোড়া না থাকলে, এই মাসের কাজ ওটাই।

ধাপ ৮: ডোমেইন আর হোস্টিংয়ের তারিখ

ডোমেইন রিনিউ করতে ভুলে গেলে সাইট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, আর বেশিদিন ফেলে রাখলে নামটা অন্য কেউ কিনে নিতে পারে। দেখে নিন:

  • ডোমেইন কবে রিনিউ করতে হবে
  • হোস্টিং কবে রিনিউ
  • রিনিউর ইমেল যে ইমেলে আসে, সেটা আপনি নিয়মিত দেখেন কিনা
  • সাইটের ঠিকানার পাশে তালার চিহ্ন (https) ঠিকঠাক দেখাচ্ছে কিনা

অটো-রিনিউ চালু রাখতে পারলে সবচেয়ে ভালো। তারিখগুলো একটা খাতায় বা ফোনের ক্যালেন্ডারেও লিখে রাখুন।

ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: সাইটের বেশিরভাগ বড় প্রবলেম হঠাৎ আসে না — ধীরে ধীরে জমে। একটা ফর্ম তিন মাস ধরে কাজ করছে না, ব্যাকআপ ছ'মাস বন্ধ, প্লাগইন এক বছর আপডেট হয়নি। মাসে আধ ঘণ্টার এই চেকটাই এগুলো ছোট থাকতে ধরে ফেলে, যখন ঠিক করা সহজ আর কম ঝামেলার।

তিন মাসে আর বছরে একবার যা দেখবেন

মাসিক লিস্টের বাইরে কয়েকটা কাজ মাঝে মাঝে করলেই চলে:

তিন মাসে একবার

  • সাইটের লেখা একবার পড়ে দেখুন — কিছু পুরনো হয়ে গেছে কিনা।
  • নতুন কাজ বা দোকানের নতুন ছবি দিন।
  • কাস্টমার রোজ কী জিজ্ঞেস করেন, সেগুলোর উত্তর সাইটে আছে কিনা দেখুন।

বছরে একবার

  • ব্যাকআপ থেকে সাইট ফেরানো যায় কিনা, একবার টেস্ট করিয়ে নিন।
  • সাইটের অ্যাডমিন, হোস্টিং আর ডোমেইনের পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করুন, আর কার কার কাছে লগইন আছে দেখে নিন।
  • যে স্টাফ বা পুরনো ডেভেলপার এখন আর কাজ করেন না, তাঁদের অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দিন।

কখন নিজে না করে কাউকে ডাকবেন

এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে ডেভেলপারকে দেখান:

  • সাইটে অচেনা লেখা, লিংক বা পপ-আপ দেখাচ্ছে
  • Google সার্চে আপনার সাইটের নিচে অদ্ভুত বা অন্য ভাষার লেখা আসছে
  • আপডেটের পর সাইট সাদা হয়ে গেছে বা এরর দেখাচ্ছে
  • হোস্টিং কোম্পানি থেকে সাইট নিয়ে ওয়ার্নিং ইমেল এসেছে

পুরো বিষয়টা আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্সের পুরো গাইড — সেখানে স্পিড, সিকিউরিটি আর ব্যাকআপ নিয়ে আলাদা করে বলেছি।

শেষ কথা

এই ওয়েবসাইট মেইনটেন্যান্স চেকলিস্ট প্রিন্ট করে রাখুন বা ফোনে সেভ করে নিন। মাসে একদিন আধ ঘণ্টা — এর বেশি লাগে না। সাইট ঠিকঠাক থাকলে কাস্টমারও ঠিকঠাক পৌঁছন।

নিজে এসব সামলানোর সময় না থাকলে দায়িত্বটা আমাকে দিতে পারেন। কী কী দেখি, সার্ভিস পেজে পাবেন — আর সরাসরি যোগাযোগ করুন, WhatsApp-এ সাইটের লিংক পাঠালেই হবে।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

Website maintenance কি মাসে একবার করলেই যথেষ্ট?

বেশিরভাগ ব্যবসার সাইটের জন্য হ্যাঁ, মাসে একবার মন দিয়ে দেখলেই চলে। তবে অফার, ছুটি বা দোকানের টাইমিং চেঞ্জ হলে সেদিনই সাইটে আপডেট করে দিন — এর জন্য মাস শেষ হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। আর অনলাইনে রোজ অর্ডার আসে এমন সাইট হলে কিছু জিনিস সপ্তাহে একবার দেখা ভালো।

WordPress-এর প্লাগইন আপডেট দিলে সাইট ভেঙে যাবে না তো?

সাধারণত যায় না, কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো প্লাগইনের সঙ্গে অন্যটার মেলে না। তাই আপডেটের আগে সব সময় ব্যাকআপ নিন, একসঙ্গে সব না করে একটা একটা করে আপডেট দিন, আর প্রতিবার পরে সাইটটা খুলে দেখুন। কিছু গোলমাল হলে ব্যাকআপ থেকে ফেরত যাওয়া যায়।

সাইট স্লো হলে নিজে কী করতে পারি?

প্রথমে দেখুন সম্প্রতি বড় সাইজের ছবি তুলেছেন কিনা — মোবাইলে তোলা ছবি সরাসরি তুললে সাইট ভারী হয়। ছবি ছোট করে আবার তুলুন, আর যে প্লাগইন কাজে লাগে না সেটা সরিয়ে দিন। তারপরও স্লো থাকলে হোস্টিং বা সাইটের স্ট্রাকচারে প্রবলেম থাকতে পারে, সেটা ডেভেলপারকে দেখান।

Search Console-এ লাল এরর দেখলে কি ভয়ের কিছু আছে?

সব এরর ভয়ের নয়। কিছু পেজ ইচ্ছে করেই Google-এ দেখানো হয় না, সেগুলোও রিপোর্টে আসে। দেখুন আপনার দরকারি পেজ — হোম, সার্ভিস, যোগাযোগ — Google-এ আছে কিনা। ওগুলো বাদ পড়লে তবেই চিন্তার, তখন কাউকে দিয়ে দেখিয়ে নিন।

সাইট অন্য কেউ বানিয়েছেন, আমার কাছে লগইন নেই — কী করব?

আগে যিনি সাইট বানিয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে তিনটে লগইন চেয়ে নিন — সাইটের অ্যাডমিন, হোস্টিং আর ডোমেইন। এগুলো আপনার ব্যবসার জিনিস, আপনার কাছেই থাকা উচিত। লগইন ছাড়াও এই চেকলিস্টের প্রথম তিনটে ধাপ — সাইট খোলা, যোগাযোগ টেস্ট আর ডিটেলস মেলানো — যে কেউ মোবাইল থেকেই করতে পারেন।

সর্বশেষ আপডেট:

#Google #SEO #ওয়েবসাইট

WhatsApp