দোকানের ওয়েবসাইট: মিষ্টি, হার্ডওয়্যার বা কাপড়ের দোকানের গাইড

দোকানের ওয়েবসাইট (website for shop) দেখতে যেমনই হোক, কাজ তিনটে: কাস্টমারকে জানানো আপনার দোকানে কী কী পাওয়া যায়, দোকান কোথায় আর কখন খোলা, আর এক টিপে ফোন বা WhatsApp-এ অর্ডারের অপশন দেওয়া। মিষ্টির দোকানের সাইটে খাবারের ছবি আর অর্ডারের নিয়ম আসল, হার্ডওয়্যারে কোন কোম্পানির মাল আর কোন সাইজ, কাপড়ের দোকানে নতুন কালেকশনের ছবি। বাকিটা সাজানোর ব্যাপার।
নিচে আগে তিন রকম দোকান পাশাপাশি কম্পেয়ার করেছি, তারপর আলাদা করে প্রতিটার কথা।
তিন রকম দোকান, পাশাপাশি
| মিষ্টির দোকান | হার্ডওয়্যারের দোকান | কাপড়ের দোকান | |
|---|---|---|---|
| কাস্টমার কী খোঁজেন | আজ কী পাওয়া যাবে, অর্ডার দেওয়া যায় কিনা | মালটা আছে কিনা, কোন কোম্পানি, কোন সাইজ | নতুন কী এল, ছবি, কোন রেঞ্জ |
| সাইটে সবচেয়ে জরুরি | খাবারের আসল ছবি, স্পেশাল আইটেম, বড় অর্ডারের নিয়ম | ক্যাটাগরি লিস্ট, ব্র্যান্ডের নাম, ডেলিভারি | কালেকশনের ছবি, ক্যাটাগরি, শোরুমের ছবি |
| মেন বাটন | "অর্ডার দিন — WhatsApp" | "মালের লিস্ট পাঠান — WhatsApp" | "ছবি দেখে জিজ্ঞেস করুন — WhatsApp" |
| সিজনের কাজ | পুজো, বিয়ের সিজন, শীতের নলেন গুড় | বর্ষার আগে ছাদ-পাইপের কাজ, পুজোর আগে রং | পুজো, ঈদ, বিয়ের সিজন, পয়লা বৈশাখ |
| বড় কাস্টমার | বিয়ে, অন্নপ্রাশন, অফিসের অর্ডার | ঠিকাদার, মিস্ত্রি, প্রোমোটার | বিয়ের বাড়ি, শাড়ির দোকানি (পাইকারি হলে) |
সব দোকানের ওয়েবসাইটে যা লাগবেই
ধরন যাই হোক, এই জিনিসগুলো ছাড়া দোকানের ওয়েবসাইট অর্ধেক:
- দোকানের নাম আর এক লাইনে ইন্ট্রো — "শ্যামবাজারে পঞ্চাশ বছরের মিষ্টির দোকান" জাতীয় স্পষ্ট কথা।
- ঠিকানা আর ল্যান্ডমার্ক — "পাঁচমাথার মোড় থেকে দু'মিনিট"।
- Google Maps — যাতে এক টিপে রাস্তা দেখা যায়।
- খোলার সময় আর ছুটির দিন — পুজোর সময় আলাদা হলে সেটাও।
- ফোন আর WhatsApp বাটন — প্রতি পেজে, মোবাইলে সহজে টেপার মতো।
- পেমেন্ট — ক্যাশ, UPI, Google Pay, PhonePe, কার্ড — যা যা নেন।
- হোম ডেলিভারি — দেন কিনা, কোন কোন এলাকায়।
- দোকানের আসল ছবি — বাইরে থেকে বোর্ড সহ, আর ভেতরের।
- Google রিভিউ — প্রোফাইলের লিংক।
একটা জিনিস মনে রাখুন — সাইটে, Google Business Profile-এ আর ফেসবুকে দোকানের নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বর হুবহু এক রাখুন। Google নিজেও ব্যবসার ডিটেলস পরিষ্কার রাখতে বলে।
মিষ্টির দোকানের ওয়েবসাইট
মিষ্টি চোখে দেখে কেনার জিনিস। তাই এখানে ছবিই সব।
কী রাখবেন:
- রোজকার মিষ্টির ছবি, নাম সহ। প্রতিটা মিষ্টির জন্য আলাদা পেজ লাগে না — ক্যাটাগরি ধরে ভাগ করুন (রসের মিষ্টি, সন্দেশ, দই, নোনতা)।
- সিজনের স্পেশাল — শীতের নলেন গুড়, জামাইষষ্ঠী, বিজয়া, ভাইফোঁটা। এই সময়গুলোতে লোকে সবচেয়ে বেশি সার্চ করেন।
- বড় অর্ডারের নিয়ম — বিয়ে, অন্নপ্রাশন, অফিস — কত দিন আগে জানাতে হয়, ডেলিভারি দেন কিনা।
- দই বা মিষ্টি কতক্ষণ ভালো থাকে, কিভাবে রাখবেন — কাস্টমার এটা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন।
ধরুন, হাওড়ার এক মিষ্টির দোকান পুজোর দু'সপ্তাহ আগে সাইটে একটা পেজ খুলল — "বিজয়ার মিষ্টির অর্ডার"। সঙ্গে ছবি আর WhatsApp বাটন। পাড়ার যে কেউ বাড়ি বসেই অর্ডার দিতে পারবেন, দোকানে লাইনও একটু কমবে।
খাবারের ব্যবসার সাইট নিয়ে আরও লিখেছি রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইট নিয়ে লেখায় — মেনু আর অর্ডারের অনেক কথা মিষ্টির দোকানেও খাটে।
হার্ডওয়্যারের দোকানের ওয়েবসাইট
হার্ডওয়্যারের কাস্টমার তাড়াহুড়োয় থাকেন। মিস্ত্রি কাজ ফেলে এসেছেন, একটা সাইজের পাইপ লাগবে এখনই।
কী রাখবেন:
- ক্যাটাগরি — প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল, রং, সিমেন্ট-বালি, টুলস, স্যানিটারি।
- কোন কোম্পানির মাল রাখেন — লোকে কোম্পানির নাম দিয়েই সার্চ করেন। যে কোম্পানিগুলোর মাল সত্যিই রাখেন, শুধু সেগুলোর নাম দিন।
- "লিস্ট পাঠান" অপশন — মিস্ত্রি বা ঠিকাদার WhatsApp-এ মালের লিস্টের ছবি পাঠাবেন, আপনি রেট আর স্টক জানাবেন। এটাই হার্ডওয়্যারের সবচেয়ে কাজের ফিচার।
- ডেলিভারি — ভারী মাল সাইটে পৌঁছে দেন কিনা, কোন কোন এলাকায়।
- ঠিকাদার আর মিস্ত্রিদের জন্য আলাদা অংশ — নিয়মিত কাস্টমারদের জন্য কী বেনিফিট দেন (ক্রেডিট, তাড়াতাড়ি ডেলিভারি), সেটা লিখুন।
সব জিনিসের লিস্ট দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। হাজার হাজার আইটেম তুলতে গিয়ে সাইট আর কোনোদিন শেষ হবে না। মেন ক্যাটাগরি, ব্র্যান্ড আর "যা খুঁজছেন না পেলে জানান" — এটুকুই যথেষ্ট।
কাপড়ের দোকানের ওয়েবসাইট
কাপড়ের কাস্টমার দেখতে ভালোবাসেন। কেনার আগে অনেকে বাড়ির লোককে ছবি দেখান।
কী রাখবেন:
- ক্যাটাগরি ধরে ছবি — শাড়ি, সালোয়ার, ছোটদের জামা, ছেলেদের পাঞ্জাবি।
- নতুন কালেকশন — পুজো, বিয়ের সিজন, পয়লা বৈশাখের আগে আলাদা পেজ।
- আসল ছবি — দোকানে তোলা, ভালো আলোয়। কোম্পানির ক্যাটালগের ছবি নয়। রং যেন আসলের মতো দেখায়, নইলে পরে কমপ্লেন আসে।
- "এই শাড়িটা আছে?" বাটন — প্রতিটা ছবির পাশে WhatsApp বাটন, ছবির নাম বা কোড সহ মেসেজ।
- শোরুমের ছবি আর ট্রায়ালের ব্যবস্থা — বসার জায়গা, ট্রায়াল রুম আছে কিনা।
- এক্সচেঞ্জের নিয়ম — কত দিনের মধ্যে, কোন অবস্থায় এক্সচেঞ্জ করা যায়। পরিষ্কার লেখা থাকলে ঝামেলা কমে।
ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: দোকানের মালিকেরা প্রায়ই প্রথমেই পুরো অনলাইন শপ চান — কার্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে, সব। কিন্তু হাজারটা প্রোডাক্ট তোলা, স্টক মেলানো আর রোজ অর্ডার সামলানোর লোক না থাকলে সেই সাইট কয়েক মাসেই পুরনো হয়ে যায়। আমি সাধারণত বলি, আগে পরিষ্কার একটা সাইট আর WhatsApp অর্ডার দিয়ে শুরু করুন। ডিমান্ড বুঝে তারপর বাড়ান।
WhatsApp অর্ডার: সাইট আর দোকানের মাঝের সেতু
বেশিরভাগ দোকানের কাস্টমার অনলাইনে কার্টে জিনিস ভরে পেমেন্ট করার চেয়ে WhatsApp-এ কথা বলতে বেশি কমফর্টেবল। তাই সাইটে WhatsApp বাটনটা ঠিকঠাক বসানো খুব দরকারি।
একটা কাজের ট্রিক — বাটনে আগে থেকে মেসেজ লিখে রাখা যায়, যেমন "ওয়েবসাইট থেকে লিখছি, এই জিনিসটা আছে কিনা জানতে চাই"। তাতে কাস্টমারকে কিছু টাইপ করতে হয় না, আর আপনিও বোঝেন মেসেজটা সাইট থেকে এল। কিভাবে বসাবেন, স্টেপ বাই স্টেপ বলেছি ওয়েবসাইটে WhatsApp বাটন বসানোর লেখায়।
দোকানের সাইটে যে ভুলগুলো প্রায়ই চোখে পড়ে
- খোলার সময় পুরনো। দোকান এখন রাত ন'টা পর্যন্ত খোলা, সাইটে লেখা সাতটা। কাস্টমার ভাবেন বন্ধ, আসেনই না।
- ইন্টারনেটের ছবি। অন্যের দোকানের বা কোম্পানির ক্যাটালগের ছবি দেখে এসে আসল দোকান মেলাতে না পারলে ভরসা ভাঙে।
- ফোন নম্বর শুধু নিচে। মোবাইলে অনেকটা স্ক্রল করে তবে নম্বর পাওয়া যায় — ততক্ষণে অনেকে চলে যান।
- "সব পাওয়া যায়" লেখা, কিন্তু কিছুর নাম নেই। কাস্টমার স্পষ্ট জিনিস খোঁজেন — ব্র্যান্ড, সাইজ, ক্যাটাগরির নাম দিন।
- সাইট বানিয়ে ভুলে যাওয়া। দু'বছর আগের পুজোর অফার এখনও হোম পেজে — এটা দেখলে মনে হয় দোকানটাই হয়তো আর চলে না।
দোকানের ওয়েবসাইট বানানোর আগে চেকলিস্ট
ডেভেলপারের সঙ্গে কথা বলার আগে এগুলো হাতে রাখুন:
- দোকানের বাইরে (বোর্ড সহ) আর ভেতরের ১০–১৫টা ভালো ছবি।
- মেন ক্যাটাগরির লিস্ট, আর প্রতিটার কয়েকটা জিনিসের ছবি।
- যে কোম্পানিগুলোর মাল রাখেন, তাদের নামের লিস্ট।
- খোলার সময়, ছুটির দিন, ডেলিভারির এলাকা।
- পেমেন্টের অপশনের লিস্ট।
- দোকানের গল্প — কবে শুরু, কে চালান।
- কাস্টমারের কমন পাঁচটা প্রশ্ন আর তার উত্তর।
- ব্যবসার WhatsApp নম্বর (WhatsApp Business হলে ভালো)।
- Google Business Profile-এর লিংক — না থাকলে আগে খুলে ফেলুন।
অন্য ধরনের ব্যবসা হলে
আপনার দোকান যদি পার্লার, কোচিং বা ক্লিনিকের মতো সার্ভিসের ব্যবসা হয়, সাইটের গড়ন একটু আলাদা হবে। যেমন কোচিং সেন্টারের সাইটে গার্জেনের ভরসাটাই আসল — সেটা নিয়ে লিখেছি কোচিং সেন্টারের ওয়েবসাইটের লেখায়। সব রকম ব্যবসার তুলনা এক জায়গায় পাবেন কোন ব্যবসার জন্য কেমন ওয়েবসাইট দরকার লেখায়।
শেষ কথা
দোকানের ওয়েবসাইট মানে দোকানটাকেই মোবাইলে তুলে আনা — আসল ছবি, আসল জিনিস, আর কাস্টমারের প্রশ্নের সোজা উত্তর। বিরাট কিছু লাগে না। পরিষ্কার সাইট, ঠিকঠাক ইনফো আর একটা WhatsApp বাটন দিয়েই শুরু করা যায়।
আপনার দোকানের ধরন অনুযায়ী ওয়েবসাইট চান? যোগাযোগ করুন — WhatsApp-এ দোকানের নাম আর কী বিক্রি করেন জানান, কেমন সাইট আপনার কাজে আসবে বলে দেব।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
Hardware shop বা sweet shop-এর website-এ কি সব জিনিসের দাম দিতে হবে?
না, দিতেই হবে এমন নয়। হার্ডওয়্যার বা মুদির মতো দোকানে দাম রোজ চেঞ্জ হয়, সব লিখে রাখলে পুরনো হয়ে যায়। তার বদলে কী কী পাওয়া যায় আর কোন কোম্পানির মাল রাখেন, সেটা লিখুন, আর 'আজকের রেট জানতে WhatsApp করুন' বাটন দিন। যেখানে দাম মোটামুটি ফিক্সড আর আপনি নিয়মিত আপডেট করতে পারবেন, সেখানে দিতে পারেন।
অনলাইন দোকান মানে কি পুরো ই-কমার্স সাইট লাগবে?
সব দোকানের লাগে না। পাড়ার কাস্টমার বেশি হলে একটা পরিষ্কার সাইট, প্রোডাক্টের ছবি আর WhatsApp-এ অর্ডারই যথেষ্ট। দূরের শহরে মাল পাঠাতে চাইলে বা অনেক জিনিস একসঙ্গে সেল করতে চাইলে তখন কার্ট, অনলাইন পেমেন্ট আর ডেলিভারির ব্যবস্থা সহ ই-কমার্স সাইটের কথা ভাবুন।
ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে তো ছবি দিই, তাহলে সাইট কেন?
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট কয়েক দিনেই নিচে চলে যায়, আর Google-এ সার্চ করলে সব সময় আসে না। সাইটে খোলার সময়, ঠিকানা, কী কী পাওয়া যায় — সব এক জায়গায় থাকে আর Google সেটা খুঁজে পায়। সোশ্যাল মিডিয়া চালিয়ে যান, কিন্তু সব লিংক সাইটের দিকে আনুন।
দোকানের সাইট কতদিন পর পর আপডেট করব?
অন্তত মাসে একবার দেখে নিন। নতুন মাল এলে, পুজো বা উৎসবের স্পেশাল থাকলে, খোলার সময় চেঞ্জ হলে সঙ্গে সঙ্গে আপডেট করুন। পুরনো অফার বা ভুল সময় লেখা থাকলে কাস্টমার রেগে যান।
সর্বশেষ আপডেট: