রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইট: মেনু, অর্ডার আর রিভিউ এক জায়গায় রাখুন

লিখেছেন সন্দীপন দাস · ৬ মিনিটে পড়ুন · আপডেট:

রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইট — মোবাইলে খাবারের মেনু আর WhatsApp অর্ডার বাটন

রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইট (restaurant website) মানে এমন একটা জায়গা, যেখানে কাস্টমার এক নজরে আপনার মেনু, কখন খোলা, কোথায়, আর অর্ডার বা টেবিল বুকিং কিভাবে করবেন — সব পেয়ে যান। ডেলিভারি অ্যাপ থাকলেও নিজের সাইট দরকার, কারণ সেখানে আপনার নিজের নিয়মে, নিজের মতো করে রেস্টুরেন্টটা দেখানো যায়। রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, মিষ্টির দোকান বা ক্লাউড কিচেন — সবার জন্যই কথাটা খাটে।

শনিবার সন্ধ্যার একটা ছবি

ধরুন, শনিবার সন্ধ্যা সাতটা। বেহালার এক পরিবার ঠিক করল আজ বাইরে খাবে। মেয়ে মোবাইলে লিখল "বেহালা বাঙালি রেস্টুরেন্ট"। Google-এ কয়েকটা নাম এল।

একটা রেস্টুরেন্টের সাইটে ঢুকে দেখা গেল — মেনু পরিষ্কার লেখা, ভেতরে বসার জায়গার ছবি আছে, পার্কিং আছে কিনা লেখা, আর একটা WhatsApp বাটন — "টেবিল বুক করুন"। আরেকটার শুধু একটা পুরনো ফেসবুক পোস্ট, মেনুর একটা ঝাপসা ছবি।

পরিবারটা কোথায় খেতে গেল, বলার দরকার নেই।

খাবারের ব্যবসায় কাস্টমার ডিসিশন নেন খুব তাড়াতাড়ি — প্রায়ই পাঁচ মিনিটের মধ্যে। ওই পাঁচ মিনিটে যার ইনফো সবচেয়ে পরিষ্কার, সেই জেতে।

ডেলিভারি অ্যাপ বনাম নিজের সাইট

অনেকে বলেন, "Zomato-Swiggy তো আছেই, আবার সাইট কেন?" দুটোর কাজ আলাদা। একটা ছোট কম্পারিজন দেখুন:

বিষয়ডেলিভারি অ্যাপনিজের ওয়েবসাইট
কে নিয়ম ঠিক করেঅ্যাপ কোম্পানিআপনি
কাস্টমারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগসাধারণত থাকে নাফোন, WhatsApp — সরাসরি
বসে খাওয়া, পার্টি, ক্যাটারিং দেখানোখুব কম জায়গাযত খুশি দেখান
পাশের রেস্টুরেন্টএকই পেজে, এক ক্লিক দূরেআপনার পেজে শুধু আপনি
Google-এ নাম দিয়ে সার্চঅ্যাপের পেজ আসতে পারেনিজের সাইট আসে

সোজা কথায়, অ্যাপ নতুন কাস্টমার এনে দেয়। নিজের সাইট সেই কাস্টমারকে আপনার নিজের কাস্টমার বানায়।

রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইটে কী কী থাকতেই হবে

১. লেখা মেনু, ছবি নয়

এটাই সবচেয়ে কমন ভুল। মেনু কার্ডের ছবি তুলে বা PDF করে দিলে মোবাইলে জুম করে করে পড়তে হয়, কম নেটে খুলতেই চায় না। লেখা মেনু তাড়াতাড়ি খোলে, আর Google-ও বুঝতে পারে আপনার কাছে কী কী পাওয়া যায় — "কষা মাংস", "বিরিয়ানি", "ফিশ ফ্রাই"।

মেনু সাজাবেন এভাবে:

  • ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ — স্টার্টার, মেন কোর্স, ভাত-রুটি, মিষ্টি, ড্রিঙ্কস।
  • ভেজ আর নন-ভেজ আলাদা করে চিহ্ন দিন।
  • আপনার স্পেশাল আইটেমগুলো উপরে রাখুন।
  • পুজো, নববর্ষ বা শীতের স্পেশাল মেনু আলাদা সেকশনে দিন, সময় পেরোলে সরিয়ে দিন।

২. খাবারের আসল ছবি

খাবারের ব্যবসায় ছবিই সবচেয়ে বড় অ্যাড। কিন্তু ইন্টারনেট থেকে নেওয়া চকচকে ছবি নয় — আপনার রান্নাঘর থেকে বেরোনো আসল প্লেটের ছবি। দিনের আলোয়, জানলার পাশে রেখে মোবাইলে তুললেও ভালো ছবি হয়।

ভেতরের বসার জায়গা, বাইরের বোর্ড আর রান্নাঘরের পরিষ্কার ছবিও দিন। পরিষ্কার রান্নাঘর দেখলে কাস্টমারের ভরসা অনেক বাড়ে।

৩. অর্ডার আর বুকিং-এর সহজ রাস্তা

কাস্টমার যেন এক টিপে অর্ডার বা বুকিং করতে পারেন:

  • WhatsApp বাটন — আগে থেকে লেখা মেসেজ সমেত, যেমন "টেবিল বুক করতে চাই"।
  • ফোন বাটন — মোবাইলে টিপলেই কল।
  • ডেলিভারি অ্যাপের লিংক — যাঁরা অ্যাপেই অর্ডার করতে চান, তাঁদের জন্য।
  • পেমেন্ট — UPI, Google Pay, PhonePe, কার্ড নেন কিনা, পরিষ্কার লিখে দিন।

৪. কখন খোলা, কোথায়, কিভাবে আসবেন

খোলার সময়, কোন দিন বন্ধ, আর একটা Google Maps লিংক। সঙ্গে চেনা ল্যান্ডমার্ক — "মোড়ের পেট্রোল পাম্পের পাশে"। পার্কিং আছে কিনা, লিফট আছে কিনা — এগুলো ছোট ডিটেলস, কিন্তু পরিবার নিয়ে যাঁরা আসেন তাঁদের কাছে খুব দরকারি।

৫. রিভিউ

নতুন কাস্টমার আগে দেখেন অন্যরা কী বলছেন। Google রিভিউ থেকে কয়েকটা আসল কথা সাইটে দেখান, আর রিভিউ লেখার লিংক দিন। রিভিউ বাড়ানোর সহজ উপায় নিয়ে Google রিভিউ বাড়ানোর এই গাইডে ডিটেলসে লিখেছি।

৬. পার্টি, ক্যাটারিং আর বাল্ক অর্ডার

জন্মদিন, অফিস পার্টি, অন্নপ্রাশন বা বিয়ের অর্ডার নেন? তাহলে এটার জন্য আলাদা একটা সেকশন রাখুন। কত লোকের অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে পারেন, কতদিন আগে জানাতে হয়, কী কী প্যাকেজ — সব লিখে দিন। এখান থেকেই অনেক সময় সবচেয়ে বড় অর্ডারগুলো আসে।

৭. লাইসেন্স আর ভরসার তথ্য

FSSAI লাইসেন্স নম্বর সাইটের নিচের দিকে দিয়ে রাখলে ভরসা বাড়ে। কবে থেকে চালাচ্ছেন, রান্নার দায়িত্বে কে — এই ছোট গল্পগুলোও কাস্টমার পড়তে ভালোবাসেন।

ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: রেস্টুরেন্টের সাইটে আমি সবার আগে দেখি মেনুটা মোবাইলে কত তাড়াতাড়ি খোলে। অনেক সাইটে বড় বড় ছবি আর অ্যানিমেশনের জন্য মেনু আসতেই অনেকক্ষণ লাগে — ততক্ষণে খিদে পাওয়া কাস্টমার অন্য সাইটে চলে গেছেন। হালকা সাইট আর পরিষ্কার লেখা মেনু, এটাই আসল জিনিস।

ব্যবসা অনুযায়ী একটু আলাদা করে ভাবুন

সব খাবারের ব্যবসার সাইট এক রকম হবে না:

  • রেস্টুরেন্ট — বসার জায়গা, পরিবেশ, টেবিল বুকিং আর পার্টি অর্ডার বেশি জোর দিয়ে দেখান।
  • ক্যাফে — পরিবেশের ছবি, Wi-Fi আছে কিনা, কফি আর স্ন্যাকসের মেনু, বসে কাজ করা যায় কিনা।
  • মিষ্টির দোকান — উৎসবের অর্ডার, বিয়ে-অনুষ্ঠানের বাল্ক অর্ডার, কোন মিষ্টি কোন দিন পাওয়া যায়।
  • ক্লাউড কিচেন — বসার জায়গা নেই, তাই সাইটটাই আপনার দোকান। কোন কোন এলাকায় ডেলিভারি দেন, অর্ডারের শেষ সময়, আর WhatsApp অর্ডার একদম উপরে।

অন্য ধরনের ব্যবসার সাইটে কী থাকে, তার তুলনা দেখতে ব্যবসা অনুযায়ী ওয়েবসাইট গাইডটা পড়ে নিন। ডাক্তারের চেম্বারের মতো একেবারে আলাদা ব্যবসার এক্সাম্পল চাইলে ক্লিনিকের ওয়েবসাইট নিয়ে লেখাটা দেখতে পারেন — সময় আর বুকিং দেখানোর কথাগুলো রেস্টুরেন্টেও কাজে লাগে।

Google Business Profile আর সাইট — দুটো মিলিয়ে চালান

"কাছাকাছি রেস্টুরেন্ট" লিখে সার্চ করলে ম্যাপে যে কয়েকটা নাম আগে আসে, সেগুলো Google Business Profile থেকে আসে। তাই:

  • প্রোফাইলে ঠিক ক্যাটাগরি দিন — যেমন "Bengali restaurant", "Cafe" বা "Sweet shop"।
  • প্রোফাইলে মেনুর লিংক আর ওয়েবসাইটের লিংক দিন।
  • নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বর সাইট, প্রোফাইল আর ডেলিভারি অ্যাপে হুবহু এক রাখুন।
  • ছুটির দিন আর পুজোর টাইমিং চেঞ্জ হলে সব জায়গায় একসঙ্গে আপডেট করুন।

প্রোফাইলের নাম কিন্তু হুবহু দোকানের বোর্ডের নামই হবে — "বেস্ট বিরিয়ানি কলকাতা" জুড়ে দেবেন না। Google-এর ব্যবসার তথ্য দেওয়ার গাইডলাইনে এই নিয়মগুলো পরিষ্কার লেখা আছে।

সাইট বানানোর আগে এই চেকলিস্টটা মিলিয়ে নিন

  1. মেনুর সব আইটেম লিখে ফেলুন, ক্যাটাগরি ধরে।
  2. স্পেশাল ডিশ, বসার জায়গা, বাইরের বোর্ড আর রান্নাঘরের ছবি তুলে রাখুন।
  3. খোলার সময়, বন্ধের দিন আর ছুটির নিয়ম ঠিক করুন।
  4. অর্ডার নেওয়ার জন্য কোন WhatsApp নম্বর, কে উত্তর দেবেন — ঠিক করুন।
  5. পার্টি বা ক্যাটারিং নিলে তার নিয়ম লিখে রাখুন।
  6. FSSAI নম্বর আর অন্য লাইসেন্সের ডিটেলস হাতের কাছে রাখুন।
  7. মেনু কে আপডেট করবেন, সেটা আগে থেকে ঠিক করে নিন।

এগুলো হাতে থাকলে সাইট বানানো অনেক তাড়াতাড়ি হয়।

কয়েকটা ভুল যা এড়িয়ে চলবেন

  • পুরনো মেনু ফেলে রাখা — সাইটে যে আইটেম দেখছেন, দোকানে এসে শুনলেন "ওটা আর হয় না" — কাস্টমার খুব বিরক্ত হন।
  • ফোন নম্বর খুঁজে না পাওয়া — নম্বর একদম নিচে লুকিয়ে রাখবেন না। মোবাইলে উপরেই রাখুন।
  • গান চালিয়ে দেওয়া — সাইট খুললেই গান বাজলে বেশিরভাগ লোক সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যান।
  • খাবারের ভুল ছবি — ছবিতে যা দেখাচ্ছেন, প্লেটে যেন সেটাই আসে।

শেষ কথা

রেস্টুরেন্টের ওয়েবসাইট বিরাট কিছু হতে হবে না। পরিষ্কার মেনু, আসল ছবি, ঠিক সময় আর এক টিপে WhatsApp — এই চারটে থাকলেই খিদে পাওয়া কাস্টমার আপনার দরজায় আসবেন।

আমি কী কী ধরনের সাইট বানাই, সার্ভিস পেজে দেখতে পারেন। আপনার রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে বা মিষ্টির দোকানের জন্য কেমন সাইট মানাবে জানতে চাইলে সরাসরি যোগাযোগ করুন — WhatsApp-এ আপনার ব্যবসার কথা লিখে পাঠালেই হবে।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

Zomato আর Swiggy-তে আছি, তাহলে কি নিজের restaurant website লাগে?

ডেলিভারি অ্যাপ অর্ডার আনে, কিন্তু ওখানে আপনার রেস্টুরেন্ট আরও অনেকের পাশে একটা লিস্টের লাইন মাত্র। নিজের সাইটে আপনার পুরো মেনু, বসে খাওয়ার জায়গা, পার্টি বুকিং আর সরাসরি WhatsApp অর্ডার — সব নিজের মতো করে দেখাতে পারেন। দুটো একসঙ্গে রাখাই ভালো।

মেনু ছবি হিসেবে দেব, না লিখে দেব?

লিখে দিন। লেখা মেনু মোবাইলে তাড়াতাড়ি খোলে, জুম করতে হয় না, আর Google-ও পড়তে পারে। চাইলে পাশে খাবারের ছবি দিন, কিন্তু পুরো মেনুটা একটা ঝাপসা ছবি বা PDF করে দেবেন না।

মেনুতে আইটেম চেঞ্জ হলে বারবার সাইট আপডেট করতে হবে?

হ্যাঁ, মেনু যেটা দেখাবেন সেটা আপডেট রাখতেই হবে। তাই সাইটটা এমনভাবে বানিয়ে নিন যাতে মেনু আপনি বা আপনার স্টাফ নিজেরাই মোবাইল থেকে আপডেট করতে পারেন — প্রতিবার ডেভেলপারকে ফোন করতে না হয়।

মিষ্টির দোকান বা ক্লাউড কিচেনেরও কি ওয়েবসাইট কাজে আসে?

আসে। মিষ্টির দোকানে পুজো-বিয়ের অর্ডার, আর ক্লাউড কিচেনে সরাসরি WhatsApp অর্ডার — দুটোই সাইট থেকে সহজ হয়। ক্লাউড কিচেনের বসার জায়গা নেই বলে সাইটটাই ওদের দোকানের সামনের অংশের কাজ করে।

সর্বশেষ আপডেট:

#WhatsApp #ওয়েবসাইট #রিভিউ #রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে আর হোটেলের ওয়েবসাইট #লোকাল ব্যবসা

WhatsApp