বিদেশ থেকে ওয়েবসাইট সামলানো: দেশের ব্যবসার সাইট দূরে বসে চালানোর গাইড

লিখেছেন সন্দীপন দাস · ৭ মিনিটে পড়ুন

বিদেশ থেকে ওয়েবসাইট সামলানো — ল্যাপটপে সাইটের লগইন আর দেশের দোকানের সঙ্গে WhatsApp-এ কথা

বিদেশ থেকে ওয়েবসাইট সামলানো মোটেই কঠিন নয়, যদি তিনটে জিনিস ঠিক থাকে: সব অ্যাকাউন্টের মালিকানা পরিবারের হাতে, প্রত্যেকের আলাদা লগইন (website access control), আর কে কোন কাজ করবেন তার একটা সোজা নিয়ম। NRI family business website হোক বা প্রবাসী পরিবারের দোকানের সাইট, manage website remotely করার আসল কথা এটাই। আপনি লন্ডন, দুবাই বা টরন্টোয় থাকলেও দেশের ব্যবসার সাইট ঠিকঠাক চলতে পারে।

ধরুন, আপনি টরন্টোয় থাকেন। কলকাতায় বাবার দোকান। পাড়ার একটা ছেলে কয়েক বছর আগে সাইট বানিয়ে দিয়েছিল। এক সকালে দাদা ফোন করে বললেন, "সাইট খুলছে না।" আপনি লগইন করতে গেলেন, OTP গেল বাবার পুরনো নম্বরে। ডোমেইন রিনিউয়ের মেল যাচ্ছিল সেই ছেলেটির কাছে। আর ছেলেটি এখন ফোন ধরে না।

এই লেখা এমন দিন যাতে না আসে, তার জন্য। দেশের ব্যবসা, বিদেশে আপনি — এই সেটআপটা ঠিক করে নেওয়ার পুরো প্ল্যান এখানে।

বিদেশে বাঙালির ব্যবসা আর সাইট নিয়ে বড় ছবিটা আছে বিদেশে বাঙালির ব্যবসার পুরো গাইডে। এখানে শুধু দূরে বসে সামলানোর কথা।

বিদেশ থেকে ওয়েবসাইট চালাতে গিয়ে কোথায় আটকায়

প্রবলেমটা সাধারণত টেকনিক্যাল নয়। প্রবলেম হল দূরত্ব আর অগোছালো অ্যাক্সেস।

  • চাবি অন্যের হাতে — ডোমেইন, হোস্টিং বা Google প্রোফাইল এমন কারও নামে, যাঁকে এখন পাওয়া যায় না।
  • OTP দেশের নম্বরে — আপনি লগইন করছেন রাত দুটোয়, কোড যাচ্ছে দেশে, সেখানে তখন কেউ জেগে নেই বা দোকানে ব্যস্ত।
  • একটাই পাসওয়ার্ড সবার — কে কী চেঞ্জ করলেন বোঝার উপায় নেই।
  • টাইম জোনের ফারাক — দেশে দোকান খোলার সময় সাইট বন্ধ, আপনি তখন ঘুমোচ্ছেন।
  • চোখের আড়াল — আপনি বিদেশ থেকে দেখে ভাবছেন সব ঠিক, অথচ দেশের কাস্টমারের মোবাইলে অন্য ছবি।

নিচের স্টেপগুলো এই পাঁচটাই সামলায়।

প্রথম কাজ: এক পাতায় সব অ্যাকাউন্টের লিস্ট

একটা Google Sheet বা ডকুমেন্টে লিখে ফেলুন, কোন জিনিস কার হাতে। পাসওয়ার্ড এখানে লিখবেন না, শুধু লিস্ট।

অ্যাকাউন্টমালিক কে হবেনরোজকার কাজ কে করবেন
ডোমেইনব্যবসার মালিক, ইমেল আপনিও খুলতে পারেনরিনিউ দেখবেন আপনি
হোস্টিংব্যবসার মালিক বা আপনিডেভেলপার
ওয়েবসাইটের অ্যাডমিনআপনিস্টাফ, নিজের কম ক্ষমতার লগইনে
Google Business Profileব্যবসার মালিক বা আপনিদোকানের লোক, ম্যানেজার হিসেবে
Search Console, Analyticsআপনিডেভেলপার, দেখার অ্যাক্সেসে
ব্যবসার ইমেলব্যবসার মালিকদরকার মতো দুজনে
পেমেন্ট অ্যাকাউন্টব্যবসার মালিকদেশে ভরসার একজন

ব্যবসা যাঁর নামে, কাগজে-কলমে মালিকও তিনিই থাকুন। আপনি বিদেশে আছেন বলে সব নিজের নামে নিতে হবে, এমন নয়। শুধু খেয়াল রাখুন, প্রতিটা জায়গায় যেন আপনারও ঢোকার রাস্তা থাকে, আর সেটা পরিবার জানে।

রিনিউয়ের মেল আর রিকভারি ইমেল এমন ঠিকানায় রাখুন, যেটা আপনি রোজ খোলেন। একজনের ব্যক্তিগত ইমেলের বদলে admin@আপনার-ডোমেইন ধরনের একটা ঠিকানা করে দুজনের কাছে ফরওয়ার্ড করলে আরও ভালো। তবে ডোমেইনের নিজের রিকভারি ইমেলটা ওই ডোমেইনের বাইরের হওয়া চাই, নইলে ডোমেইন বন্ধ হলে মেলও বন্ধ।

Website access control: কাকে কতটা অ্যাক্সেস দেবেন

নিয়মটা এক লাইনের। যাঁর যতটা কাজ, ততটাই অ্যাক্সেস। আর প্রত্যেকের নিজের নামে লগইন।

ওয়েবসাইট। WordPress-এ আলাদা আলাদা রোল আছে। Administrator সব পারেন, Editor লেখা আর পেজ সামলান, Author শুধু নিজের লেখা। দোকানের যিনি অফার আর ছবি আপডেট করেন, তাঁর জন্য Editor-ই যথেষ্ট। সাইট অন্য কিছুতে বানানো হলেও এই একই নিয়ম খাটে।

Google Business Profile। Google-এর owner আর manager-এর নিয়ম অনুযায়ী একটা প্রোফাইলে কয়েকজন owner আর manager থাকতে পারেন। Manager প্রায় সব কাজ পারেন, শুধু লোক যোগ-বাদ বা প্রোফাইল ডিলিট করতে পারেন না। তাই দোকানের লোককে manager করুন, নিজের Google পাসওয়ার্ড দেবেন না। ভেরিফিকেশন আবার চাইলে দোকানে থাকা কাউকে করতে হতে পারে, এটাও মাথায় রাখুন।

পাসওয়ার্ড। WhatsApp-এ পাসওয়ার্ড পাঠাবেন না। একটা পাসওয়ার্ড ম্যানেজার অ্যাপ নিন, যেখানে পরিবারের সঙ্গে সেফ ভাবে শেয়ার করা যায়। ডেভেলপার বা স্টাফ কাজ ছাড়লে সেদিনই তাঁর অ্যাক্সেস বন্ধ করুন।

OTP আর ফোন নম্বরের ফাঁদ

দূরে থাকলে এখানেই সবচেয়ে বেশি আটকায়। তিনটে কাজ করে রাখুন:

  1. Authenticator অ্যাপ সেট করুন। যেখানে অপশন আছে, SMS-এর বদলে অ্যাপের কোড নিন। দেশের নম্বরে রোমিং না থাকলেও কাজ চলবে।
  2. ব্যাকআপ কোড সেভ করে রাখুন। ফোন হারালে বা বদলালে এগুলোই ভরসা। Google সহ অনেক সার্ভিসে এই অপশন থাকে।
  3. দেশের নম্বরটা বন্ধ হতে দেবেন না। কোনো অ্যাকাউন্ট যদি একটা SIM-এ বাঁধা থাকে, সেটা চালু রাখার দায়িত্ব কারও একজনের হোক।

পেমেন্ট অ্যাকাউন্ট আলাদা ব্যাপার। অনেক দেশে এগুলো ব্যবসার কাগজ আর সেই দেশের নম্বরে বাঁধা থাকে, তাই OTP দেশেই যাবে। নিয়ম দেশ আর কোম্পানি অনুযায়ী আলাদা, সাপোর্ট থেকে জেনে নিন। বাংলাদেশে bKash বা Nagad দিয়ে পেমেন্ট নিলে এই দিকটা কিভাবে সাজাবেন, দেখতে পারেন বাংলাদেশে ব্যবসার ওয়েবসাইটের গাইডে।

দোকান আর আপনার মধ্যে কাজের ভাগ

দূরে বসে সবচেয়ে বড় ভুল হল সব কাজ নিজের ঘাড়ে নেওয়া। দোকানের খবর দোকানের লোকই সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই ভাগটা পরিষ্কার করে নিন।

  • দোকানের লোক — নতুন মাল, অফার আর ছুটির খবর একটা WhatsApp গ্রুপে পাঠাবেন। ছবি তুলে দেবেন। ফোনে সাইট খুলে কোনো ভুল দেখলে জানাবেন।
  • আপনি — সপ্তাহে একদিন ঠিক করা সময়ে সেগুলো সাইটে তুলবেন বা তোলাবেন। মাসে একবার রিপোর্ট দেখবেন।
  • ডেভেলপার বা কেয়ার সার্ভিস — আপডেট, ব্যাকআপ, সাইট ডাউন, হ্যাকের মতো কাজ।

সময় নিয়ে একটা কথা। দুই দেশের টাইম মিলিয়ে সপ্তাহে একটা স্লট ঠিক করুন, যখন দুজনেই ফ্রি। দোকানের ভিড়ের সময় ফোন করে ইনফো চাইলে কেউ খুশি হন না।

জরুরি খবর আর রোজকার খবর আলাদা রাখুন। ধরুন, পুজো বা ঈদের ছুটিতে দোকান বন্ধ। এই খবর যেন আগের দিন রাতে না আসে। একটা ছোট ক্যালেন্ডারে আগে থেকে লিখে নিন।

সাইট যখন আপনার রাতে বন্ধ হয়

টাইম জোনের ফারাক থাকলে আপনি সব সময় জেগে থাকবেন না। তাই ব্যবস্থাটা এমন হোক, যাতে আপনাকে জেগে থাকতে না হয়।

  • আপটাইম মনিটর — UptimeRobot-এর মতো টুল সাইট বন্ধ হলে ইমেল বা নোটিফিকেশন পাঠায়। আপনার সঙ্গে দেশের একজনকেও অ্যালার্ট দিন।
  • অটোমেটিক ব্যাকআপ — সার্ভারের বাইরে একটা কপি থাকা চাই, আর মাঝে মাঝে টেস্ট করা চাই।
  • ভালো হোস্টিং — দূর থেকে সামলানোর সময় সাপোর্টে কথা বলা যায় কিনা, সেটাই আসল। ব্যবসার সাইটের জন্য dronahost.com দেখতে পারেন — ক্লাউড, WordPress আর ম্যানেজড VPS হোস্টিং, সঙ্গে SSL, ব্যাকআপ আর ফ্রি মাইগ্রেশন।
  • কাউকে দায়িত্ব দেওয়া — রাত-দিন নজর রাখা একার কাজ নয়। কী কী দেখা হয়, আর কাউকে দায়িত্ব দিলে কী কী জিজ্ঞেস করবেন, লিখেছি ওয়েবসাইট কেয়ারের লেখায়।

বিদেশ থেকে দেখলে সাইট অন্যরকম লাগে

এই ব্যাপারটা অনেকেই ধরতে পারেন না। আপনি লন্ডনে বসে Google-এ দোকানের নাম সার্চ করে যা দেখছেন, দেশের কাস্টমার সেটা দেখছেন না। সার্চের রেজাল্ট জায়গা অনুযায়ী বদলায়। স্পিডও তাই। আপনার বাড়ির ফাস্ট Wi-Fi-এ সাইট দারুণ খুলছে, অথচ দেশে মোবাইল ডেটায় হয়তো ঢিমে।

তাই নিজের চোখের ওপর পুরো ভরসা করবেন না:

  • মাসে একবার দোকানের কাউকে বলুন, মোবাইল ডেটায় সাইট খুলে স্ক্রিনশট পাঠাতে।
  • কোন সার্চে সাইট আসছে, সেটা Search Console-এ দেখুন। দেশ ধরে ফিল্টার করা যায়।
  • একজন কাস্টমার সেজে সাইট থেকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দেখুন, সেটা ঠিক লোকের কাছে পৌঁছচ্ছে কিনা, আর কতক্ষণে উত্তর আসছে।

ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: ২০১৭ থেকে Fiverr আর Upwork-এ সারা পৃথিবীর ক্লায়েন্টের সঙ্গে রিমোটে কাজ করছি, তাই দূরে বসে সাইট সামলানো আমার রোজকার ব্যাপার। আমার সাজেশন হল, বছরে একবার একটা টেস্ট করুন। ধরে নিন আজ আপনার ফোনটা হারিয়ে গেল। এবার ডোমেইন, হোস্টিং, সাইট আর Google প্রোফাইল — কোনটায় ঢুকতে পারবেন, আর কোনটায় পারবেন না? যেটায় আটকাবেন, ঠিক করার কাজটা সেখান থেকেই শুরু। সাইট চালু অবস্থায় এটা ঠিক করা সহজ, বন্ধ হওয়ার পরে অনেক কঠিন।

সেটআপের চেকলিস্ট

এক সপ্তাহের মধ্যে একটা একটা করে সেরে ফেলুন:

  • সব অ্যাকাউন্টের লিস্ট বানিয়েছেন, মালিকের নাম লেখা আছে
  • ডোমেইন আর হোস্টিং পরিবারের নামে, রিনিউয়ের মেল আপনিও পান
  • রিকভারি ইমেল আর ফোন নম্বর আপডেট করেছেন
  • প্রত্যেকের নিজের লগইন আছে, কোনো কমন পাসওয়ার্ড নেই
  • পুরনো ডেভেলপার আর কর্মচারীর অ্যাক্সেস বন্ধ করেছেন
  • Authenticator অ্যাপ চালু, ব্যাকআপ কোড সেভ করা
  • Google প্রোফাইলে দোকানের লোক manager হিসেবে আছেন
  • ব্যাকআপ চলছে, একবার রিস্টোর টেস্ট করেছেন
  • আপটাইম মনিটরের অ্যালার্ট দুজনের কাছে যায়
  • সাপ্তাহিক আপডেটের জন্য WhatsApp গ্রুপ আর ঠিক করা সময় আছে
  • আপনি না থাকলে কে দেখবেন, সেই দ্বিতীয় জনের নাম ঠিক হয়েছে

শেষ কথা

দূরে থাকা কোনো প্রবলেম নয়। প্রবলেম হল এমন সেটআপ, যা একজন লোকের ফোন বা স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চাবিগুলো গুছিয়ে নিন, কাজ ভাগ করে নিন, আর একটা অ্যালার্ট চালু রাখুন। তারপর দেশের দোকান দেশেই চলবে, আর সাইট নিয়ে আপনাকে মাঝরাতে উঠে বসতে হবে না।

যে দেশেই থাকুন, WhatsApp-এ লিখুন — আপনার টাইম জোনে কল করে পুরো কাজ রিমোটে করে দিই। ব্যবসাটা কোন দেশে, সাইট এখন কার হাতে, আর আপনি কোথায় থাকেন — এটুকু লিখে যোগাযোগ করুন।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

NRI family business website-এর ডোমেইন কার নামে রাখব?

ব্যবসার আসল মালিকের নামে রাখুন। বাবার দোকান হলে নাম বাবার, কিন্তু অ্যাকাউন্টের ইমেল এমন হোক যেটা আপনিও খুলতে পারেন। ডেভেলপার বা দোকানের কর্মচারীর নামে একদমই নয়। পরে মালিকানা নিয়ে ঝামেলা হলে ডোমেইন ফেরত পাওয়া কঠিন হতে পারে।

Manage website remotely করতে কি টেকনিক্যাল জ্ঞান লাগে?

মালিকানা ঠিক রাখা, কে কতটা অ্যাক্সেস পাবেন ঠিক করা, আর মাসে একবার চেক করা — এগুলোতে কোনো কোডিং লাগে না। সাইট ডাউন, হ্যাক বা বড় আপডেটের মতো কাজের জন্য একজন ডেভেলপার বা কেয়ার সার্ভিস ঠিক করে রাখুন। আপনি শুধু দেখবেন কাজটা হচ্ছে কিনা।

Website access control-এ দোকানের স্টাফকে কি অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড দেব?

না। প্রত্যেককে নিজের নামে আলাদা লগইন দিন, আর ততটাই অ্যাক্সেস দিন যতটা কাজে লাগে। যিনি শুধু ছবি আর লেখা বদলান, তাঁর অ্যাডমিন হওয়ার দরকার নেই। কেউ কাজ ছাড়লে শুধু তাঁর অ্যাকাউন্ট বন্ধ করলেই হবে, বাকি কারও কাজ আটকাবে না।

বিদেশে দেশের নম্বরের OTP আসছে না, কী করব?

রোমিং বন্ধ থাকলে SMS না-ও আসতে পারে। তাই যেখানে অপশন আছে, SMS-এর বদলে Authenticator অ্যাপ বা ব্যাকআপ কোড সেট করুন। যেখানে দেশের নম্বর লাগবেই, যেমন অনেক পেমেন্ট অ্যাকাউন্ট, সেখানে দেশে ভরসার একজনকে ঠিক করে রাখুন।

আমি ছুটিতে বা অসুস্থ থাকলে সাইট কে দেখবে?

সেই কারণেই দ্বিতীয় একজনের কাছে পুরো অ্যাক্সেস থাকা দরকার — পরিবারের কেউ, বা আপনার ডেভেলপার। সব অ্যাকাউন্টের লিস্ট আর জরুরি ফোন নম্বর এক পাতায় লিখে রাখুন। একা আপনার মাথায় সব থাকলে আপনি না থাকলেই কাজ আটকে যাবে।

সর্বশেষ আপডেট:

#Google #WhatsApp #ওয়েবসাইট #দেশ-বিদেশের বাঙালি ব্যবসা

WhatsApp