গুগল বিজনেস প্রোফাইল অপ্টিমাইজেশন: ২০ পয়েন্টের চেকলিস্ট

প্রোফাইল খুলেছেন, ভেরিফাইও হয়ে গেছে, কিন্তু Google Maps-এ পাড়ার অন্য দোকানগুলো আপনার আগে আসছে? তাহলে দরকার ঠিকঠাক গুগল বিজনেস প্রোফাইল অপ্টিমাইজেশন (Google Business Profile optimization) — মানে প্রোফাইলের প্রতিটা ঘর সঠিক আর পুরো করে ভরা, যাতে Google বোঝে আপনি ঠিক কী করেন আর কাস্টমার এক নজরে ভরসা পান। নিচের ২০টা পয়েন্ট নিজের প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। যেখানে "না" আসবে, কাজটা সেখান থেকেই শুরু।
প্রোফাইল একদম নতুন হলে আগে গুগল বিজনেস প্রোফাইল খোলা আর সাজানোর পুরো গাইড পড়ে নিন। এই লেখাটা তাঁদের জন্য, যাঁদের প্রোফাইল আছে কিন্তু রেজাল্ট আসছে না।
আগে বুঝুন: Google কিসের ভিত্তিতে ম্যাপে দোকান সাজায়
Google নিজেই বলে, লোকাল রেজাল্ট মূলত তিনটে জিনিস দেখে ঠিক হয় (Google-এর লোকাল র্যাঙ্কিং পেজ):
| কী দেখে | সোজা কথায় | আপনার হাতে কতটা |
|---|---|---|
| রিলেভেন্স | কাস্টমার যা খুঁজছেন, আপনার প্রোফাইল তার সঙ্গে কতটা মিলছে | পুরোটাই |
| দূরত্ব | সার্চ যেখান থেকে হচ্ছে, সেখান থেকে আপনার দোকান কত দূরে | প্রায় কিছুই না |
| নাম-ডাক | আপনার ব্যবসা কতটা চেনা — রিভিউ, অনলাইনে নাম থাকা, ওয়েবসাইট | অনেকটাই, তবে সময় লাগে |
দূরত্ব আপনি চেঞ্জ করতে পারবেন না। তাই অপ্টিমাইজেশন মানে বাকি দুটোকে যতটা পারা যায় মজবুত করা। নিচের চেকলিস্ট ঠিক সেটাই করে।
২০ পয়েন্টের চেকলিস্ট
ক) বেসিক ইনফো — এখানে ভুল মানে সব ভেস্তে যাওয়া
১. নাম হুবহু বোর্ডের মতো। দোকানের সাইনবোর্ডে যা লেখা, প্রোফাইলের নামও তাই। "সেরা", "best", এলাকার নাম বা ফোন নম্বর জুড়বেন না। Google-এর ব্যবসার ডিটেলসের গাইডলাইন এটা পরিষ্কার বলে দিয়েছে।
২. ঠিকানা পুরো আর ঠিকঠাক। বাড়ির নম্বর, রাস্তা, পাড়া, পিন কোড। ল্যান্ডমার্ক থাকলে লিখুন — "স্টেশন রোড, বাজারের মোড়ের পাশে"।
৩. ম্যাপের পিন ঠিক জায়গায়। অনেক প্রোফাইলে পিন পাশের গলিতে বা রাস্তার উল্টো দিকে বসে থাকে। নিজে ম্যাপ খুলে জুম করে দেখুন, দরকার হলে পিন সরান।
৪. ফোন নম্বর চালু আর ধরা হয়। যে নম্বরে সত্যিই কেউ ফোন ধরেন, সেটা দিন। পুরনো বা বন্ধ নম্বর থাকলে এখনই চেঞ্জ করুন।
৫. খোলা-বন্ধের সময় আর ছুটির দিন। সাপ্তাহিক ছুটি তো বটেই, পুজো, ঈদ বা অন্য উৎসবে সময় চেঞ্জ হলে "স্পেশাল আওয়ার্স" দিয়ে দিন। কাস্টমার গিয়ে বন্ধ দোকান দেখলে সেই রাগ রিভিউতে আসে।
৬. ওয়েবসাইটের লিংক। সাইট থাকলে অবশ্যই দিন। সাইটে যে নাম, ঠিকানা, ফোন আছে, প্রোফাইলেও যেন হুবহু তাই থাকে।
খ) ক্যাটাগরি আর সার্ভিস — রিলেভেন্সের আসল জায়গা
৭. প্রাইমারি ক্যাটাগরি সবচেয়ে ঠিকঠাক যেটা। আপনার মূল ব্যবসা যা, সেটাই। মিষ্টির দোকান হলে মিষ্টির দোকানের ক্যাটাগরিটাই খুঁজে বেছে নিন, শুধু "Store" জাতীয় সাধারণ কিছু নয়। এই একটা ঘর ম্যাপে আপনার জায়গা অনেকটা ঠিক করে দেয়।
৮. বাড়তি ক্যাটাগরি অল্প আর সত্যি। যা সত্যিই করেন, শুধু সেগুলো। মিষ্টির দোকানে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে আলাদা ক্যাটাগরি যোগ করা যায়। যা করেন না, তা জুড়লে উল্টো রেজাল্ট হয়।
৯. সার্ভিস বা প্রোডাক্টের লিস্ট। কাস্টমার যে শব্দে খোঁজেন, সেই শব্দে লিখুন। পার্লার হলে "ফেসিয়াল", "ব্রাইডাল মেকআপ", "হেয়ার স্পা" — আলাদা আলাদা করে।
১০. ডেসক্রিপশন কাজের কথায়। কী করেন, কোথায় করেন, কবে থেকে, কেন আপনার কাছে আসবেন — সহজ ভাষায়। কিওয়ার্ড ঠাসবেন না, লিংক বা অফারের কথা এখানে নয়।
১১. অ্যাট্রিবিউট ভরুন। হুইলচেয়ারে ঢোকা যায় কিনা, UPI নেন কিনা, পার্কিং আছে কিনা, হোম ডেলিভারি — যা যা অপশন দেখায়, সত্যি হলে টিক দিন।
১২. সার্ভিস এরিয়া (যাঁরা বাড়ি গিয়ে কাজ করেন)। প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ক্যাটারার হলে যে এলাকাগুলোতে সত্যিই যান, শুধু সেগুলো দিন। গোটা জেলা লিখে দিলে লাভ হয় না।
গ) ছবি আর কনটেন্ট — ভরসার জায়গা
১৩. লোগো আর কভার ছবি। পরিষ্কার, ঝকঝকে। কভার ছবিতে দোকানের সামনেটা বা কাজের সবচেয়ে ভালো ছবি।
১৪. আসল ছবি, নিয়মিত। দোকানের বাইরে (যাতে কাস্টমার চিনতে পারেন), ভেতরে, মাল, কাজের স্যাম্পল, স্টাফ। ইন্টারনেট থেকে নামানো ছবি নয়। মাসে কয়েকটা নতুন ছবি দিলে প্রোফাইল চালু দেখায়।
১৫. ছোট ভিডিও। দোকানের ভেতরে একটা ঘোরা, বা কাজের একটা ঝলক। ফোনে তোলা হলেও চলবে, শুধু আলো ঠিক রাখুন।
১৬. আপডেট পোস্ট। নতুন মাল এল, পুজোর অফার, ছুটির খবর — ছোট পোস্ট দিন। পুরনো অফার শেষ হলে সেটা সরিয়ে ফেলুন।
ঘ) রিভিউ আর রোজকার দেখভাল — নাম-ডাকের জায়গা
১৭. রিভিউ চাওয়ার একটা সিস্টেম বানান। কাজ শেষে খুশি কাস্টমারকে রিভিউ লেখার লিংক WhatsApp-এ পাঠান। কিভাবে লিংক বের করবেন আর কিভাবে বলবেন, লিখেছি Google রিভিউ বাড়ানোর উপায় লেখায়। রিভিউয়ের বদলে কোনো ডিসকাউন্ট বা গিফট দেবেন না — এটা Google-এর নিয়মের বাইরে।
১৮. প্রতিটা রিভিউয়ের উত্তর। ভালো রিভিউতে ধন্যবাদ, খারাপ রিভিউতে ঠান্ডা মাথায় সলিউশনের কথা। নতুন কাস্টমার এই উত্তরগুলোও পড়েন।
১৯. ডুপ্লিকেট প্রোফাইল নেই তো? নিজের দোকানের নাম দিয়ে ম্যাপে সার্চ করুন। একই দোকান দু'বার এলে একটা সরানোর ব্যবস্থা করুন।
২০. মাসে একবার চেক। অনেক সময় কাস্টমার বা অন্য কেউ "এডিট সাজেস্ট" করেন, আর Google সেটা বসিয়েও দেয়। মাসে একবার প্রোফাইল খুলে দেখুন সময়, ফোন, ঠিকানা কেউ চেঞ্জ করে দেয়নি তো।
ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: প্রোফাইল দেখতে বসলে সবচেয়ে বেশি যে ভুলটা পাই, সেটা ক্যাটাগরি। মালিক হয়তো সাধারণ একটা ক্যাটাগরি বেছে রেখেছেন, যেখানে Google-এ আরও ঠিকঠাক একটা অপশন আছে। ছবি বা পোস্টের আগে এই ঘরটা ঠিক করুন — খরচ নেই, পাঁচ মিনিটের কাজ।
গুগল বিজনেস প্রোফাইল অপ্টিমাইজেশন কোথা থেকে শুরু করবেন
২০টা পয়েন্ট একদিনে করার দরকার নেই। এই অর্ডারে এগোন:
- আজই: নাম, ঠিকানা, পিন, ফোন, সময় (পয়েন্ট ১–৫)। এখানে ভুল থাকলে বাকি সব কাজ জলে যায়।
- এই সপ্তাহে: ক্যাটাগরি, সার্ভিস, ডেসক্রিপশন, অ্যাট্রিবিউট (৭–১১)।
- এই মাসে: কুড়ি-পঁচিশটা আসল ছবি, একটা ভিডিও, প্রথম পোস্ট (১৩–১৬)।
- চলতেই থাকবে: রিভিউ চাওয়া, উত্তর দেওয়া, মাসিক চেক (১৭–২০)।
কয়েকটা জিনিস যা কাজ করে না
ম্যাপে উপরে আসার শর্টকাট নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। এগুলো এড়িয়ে চলুন:
- নামে কিওয়ার্ড ঠাসা — "রায় ইলেকট্রিক্যালস বেস্ট ইলেকট্রিশিয়ান কলকাতা" লিখলে সাসপেন্ড হওয়ার চান্স বাড়ে, র্যাঙ্ক নয়।
- ভুয়ো ঠিকানা বা ভার্চুয়াল অফিস — যেখানে আপনি সত্যিই কাস্টমারকে সার্ভিস দেন না, সেই ঠিকানায় প্রোফাইল চলে না।
- কেনা বা বানানো রিভিউ — Google এগুলো সরিয়ে দেয়, আর প্রোফাইলের উপর নজরও বাড়ে।
- একই দোকানের কয়েকটা প্রোফাইল — বেশি জায়গা পাওয়া যায় না, উল্টে সবকটাই দুর্বল হয়।
ঠিক করার পরেও ম্যাপে না এলে
সব ঠিক করার পরেও কিছু জিনিস খেয়াল রাখবেন। প্রথমত, প্রোফাইল ভেরিফাই হয়েছে কিনা আবার দেখুন — নাম বা ঠিকানা চেঞ্জ করলে Google কখনও নতুন করে ভেরিফাই করতে বলে। কোথায় আটকায় আর কিভাবে পার হবেন, লিখেছি গুগল বিজনেস প্রোফাইল ভেরিফিকেশন লেখায়।
দ্বিতীয়ত, আপনি নিজে দোকানে দাঁড়িয়ে সার্চ করলে যা দেখেন, দু'কিলোমিটার দূরের কাস্টমার তা দেখেন না। তাই র্যাঙ্ক চেক করার সময় এটা মাথায় রাখুন।
তৃতীয়ত, প্রোফাইলের পেছনে একটা ভালো ওয়েবসাইট থাকলে Google আপনার ব্যবসা সম্পর্কে অনেক বেশি জানতে পারে। প্রোফাইলের লিংক থেকে কাস্টমার সাইটে এসে বাকিটা দেখে নেন।
শেষ কথা
গুগল বিজনেস প্রোফাইল একবার সাজিয়ে ফেলে রাখার জিনিস নয়, অনেকটা দোকানের শো-কেসের মতো। মাঝে মাঝে ধুলো ঝাড়তে হয়, নতুন মাল সাজাতে হয়। চেকলিস্টটা সেভ করে রাখুন, মাসে একবার মিলিয়ে নিন।
নিজে করতে সময় না পেলে বা কোথায় আটকাচ্ছে বুঝতে না পারলে আমার সার্ভিস দেখে নিন, অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন। প্রোফাইলের লিংক WhatsApp করুন — সেটআপ বা ঠিক করতে হেল্প করব।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
Google Business Profile অপ্টিমাইজ করার পর কতদিনে ম্যাপে উপরে আসব?
এর কোনো বাঁধা সময় নেই। নাম, ক্যাটাগরি বা ঠিকানার মতো বড় ভুল ঠিক করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিফারেন্স চোখে পড়তে পারে। আবার রিভিউ আর নাম-ডাক বাড়তে মাসের পর মাস লাগে। কাস্টমার আপনার দোকান থেকে কতটা দূরে বসে সার্চ করছেন, সেটাও রেজাল্ট চেঞ্জ করে দেয়।
প্রোফাইলের নামে এলাকার নাম বা 'best' লিখলে কি র্যাঙ্ক বাড়ে?
না, আর এটা Google-এর নিয়মের বাইরে। নাম হবে হুবহু আপনার দোকানের বোর্ডে যা লেখা। বাড়তি কিওয়ার্ড জুড়লে প্রোফাইল সাসপেন্ড হয়ে যেতে পারে, তখন ম্যাপ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাবেন।
রোজ পোস্ট দিলে কি ম্যাপে উপরে আসা যায়?
পোস্ট দিলে প্রোফাইল চালু আর টাটকা দেখায়, কাস্টমারও অফার বা নতুন খবর জানতে পারেন। তবে শুধু পোস্টের জোরে র্যাঙ্ক বাড়ে, এমন কোনো কথা Google বলেনি। ঠিক ক্যাটাগরি, পুরো ডিটেলস আর আসল রিভিউ — এগুলোই আসল কাজ করে।
একই দোকানের দুটো প্রোফাইল হয়ে গেছে, কী করব?
দুটো প্রোফাইল থাকলে Google আর কাস্টমার দুজনেই গুলিয়ে ফেলেন, রিভিউও দু'ভাগ হয়ে যায়। যেটায় বেশি রিভিউ আর ঠিকঠাক ইনফো আছে সেটা রাখুন, আর অন্যটা ডুপ্লিকেট হিসেবে রিপোর্ট করুন বা সরানোর জন্য Google সাপোর্টে জানান।
সর্বশেষ আপডেট: