ডোমেইন ও হোস্টিং এর পার্থক্য: সহজ উদাহরণে বুঝুন

লিখেছেন সন্দীপন দাস · ৬ মিনিটে পড়ুন · আপডেট:

ডোমেইন ও হোস্টিং এর পার্থক্য — একদিকে দোকানের ঠিকানার সাইনবোর্ড, অন্যদিকে দোকানঘর হিসেবে সার্ভার

সোজা কথায় ডোমেইন ও হোস্টিং এর পার্থক্য (domain vs hosting) হল ঠিকানা আর দোকানঘরের ডিফারেন্স। ডোমেইন হল আপনার ওয়েবসাইটের ঠিকানা — যেমন yourshop.in — যেটা লোকে টাইপ করে। হোস্টিং হল সেই জায়গা, যেখানে সাইটের সব ফাইল, ছবি আর লেখা রাখা থাকে, আর যেখান থেকে সাইটটা খোলে। একটা ছাড়া অন্যটা দিয়ে ওয়েবসাইট চলে না।

ওয়েবসাইট বানানোর কথা বলতে গেলেই এই দুটো শব্দ বারবার শোনেন। চলুন, একটা দোকানের এক্সাম্পল দিয়ে পুরোটা বুঝে নিই।

একটা দোকান দিয়ে বুঝুন

ধরুন, আপনি কৃষ্ণনগরে একটা কাপড়ের দোকান খুলবেন।

  • দোকানের নাম আর ঠিকানা — "মা দুর্গা বস্ত্রালয়, ৫ নম্বর হাই স্ট্রিট"। এটা লোকে মনে রাখে, অন্যকে বলে, খুঁজে আসে। ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে এটাই ডোমেইন।
  • দোকানঘর — যেখানে মাল সাজানো থাকে, কাস্টমার এসে দেখেন। এই ঘরটা আপনি ভাড়া নেন। ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে এটাই হোস্টিং।
  • ভেতরের সাজানো মাল, শো-কেস, বোর্ড — এটা হল ওয়েবসাইট নিজে, মানে পেজগুলো, লেখা আর ছবি।

ঠিকানা থাকলে কিন্তু ঘর না থাকলে, কাস্টমার এসে ফাঁকা জমি দেখবেন। আবার ঘর আছে কিন্তু ঠিকানা কেউ জানে না — তাহলে কেউ পৌঁছবেনই না। ওয়েবসাইটেও ঠিক তাই।

ওয়েবসাইট জিনিসটা আসলে কী আর কিভাবে কাজ করে, আরও গোড়া থেকে জানতে চাইলে পড়ুন ওয়েবসাইট কী লেখাটা।

ডোমেইন কি

ডোমেইন হল ইন্টারনেটে আপনার নাম। yourshop.com, yourclinic.in, yourcoaching.co.in — শেষের অংশটাকে বলে এক্সটেনশন (.com, .in, .co.in ইত্যাদি)।

ডোমেইন নিয়ে কয়েকটা কথা জেনে রাখুন:

  • ডোমেইন ভাড়ার মতো। একবার কিনলেই চিরকালের নয়। এক বছর বা কয়েক বছরের জন্য রেজিস্টার হয়, তারপর রিনিউ করতে হয়।
  • একই নাম দু'জনের হয় না। কেউ আগে নিয়ে নিলে সেটা আর পাবেন না, অন্য নাম বা অন্য এক্সটেনশন খুঁজতে হবে।
  • রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নেওয়া হয়। যে কোম্পানির কাছ থেকে ডোমেইন নেন, তাদের বলে রেজিস্ট্রার। গোটা সিস্টেমটা দেখে ICANN নামে একটা ইন্টারন্যাশনাল সংস্থা। ডোমেইনের মালিক হিসেবে আপনার কী কী অধিকার আর দায়িত্ব, ওদের ডোমেইন মালিকদের জন্য পেজে লেখা আছে।
  • ডোমেইনের সঙ্গে ইমেলও হয়। info@yourshop.in-এর মতো ইমেল ঠিকানা ডোমেইন দিয়েই বানানো যায় — তবে ইমেল চালানোর জন্য আলাদা ইমেল সার্ভিস বা হোস্টিং লাগে।

হোস্টিং কি

হোস্টিং হল একটা কম্পিউটার (সার্ভার), যেটা দিন-রাত ইন্টারনেটে জুড়ে থাকে। আপনার সাইটের সব ফাইল সেখানে রাখা থাকে। কেউ আপনার ডোমেইন টাইপ করলে, সেই সার্ভার থেকে পেজগুলো তাঁর মোবাইলে পৌঁছয়।

হোস্টিং মোটামুটি কয়েক রকমের:

  • শেয়ার্ড হোস্টিং — এক সার্ভারে অনেক সাইট, অনেকটা ভিড়ে ঠাসা মার্কেট কমপ্লেক্সের মতো। পাশের কোনো সাইটে চাপ বাড়লে আপনার সাইটও স্লো হতে পারে, তাই ব্যবসার সাইটের জন্য এর উপর ভরসা না করাই ভালো।
  • VPS বা ক্লাউড — সার্ভারের একটা আলাদা ভাগ শুধু আপনার। বেশি ভিজিটর বা ভারী সাইটে লাগে।
  • ম্যানেজড WordPress হোস্টিং — WordPress সাইটের জন্য বিশেষ করে সাজানো, আপডেট আর ব্যাকআপের অনেকটা কাজ ওরাই দেখে।

ডোমেইন ও হোস্টিং এর পার্থক্য: এক নজরে

ডোমেইনহোস্টিং
কীসাইটের ঠিকানা (নাম)সাইটের ফাইল রাখার জায়গা
দোকানের এক্সাম্পলেনাম আর ঠিকানাদোকানঘর
কাস্টমার কী দেখেনব্রাউজারে টাইপ করা নামসাইটের পেজ, ছবি, লেখা
চেঞ্জ করা যায়?চেঞ্জ করলে ঠিকানাই বদলে যায় — হুট করে চেঞ্জ করা উচিত নয়চেঞ্জ করা যায়, ডোমেইন একই থাকে
রিনিউরেজিস্ট্রেশন এক্সপায়ার হওয়ার আগেপ্ল্যান এক্সপায়ার হওয়ার আগে
ভুলে গেলে কী হয়সাইট আর ইমেল বন্ধ, পরে নামটাই হাতছাড়া হতে পারেসাইট বন্ধ, ফাইলও মুছে যেতে পারে

দুটো জুড়ে থাকে DNS দিয়ে। DNS অনেকটা ফোনবুকের মতো — ডোমেইন টাইপ করলে ইন্টারনেট দেখে নেয় সেই নামের সাইট কোন সার্ভারে আছে।

ডেভেলপার হিসেবে আমার কথা: ডোমেইন সব সময় ব্যবসার মালিকের নিজের অ্যাকাউন্টে, নিজের নাম আর নিজের ইমেলে রাখুন — ডেভেলপার বা এজেন্সির অ্যাকাউন্টে নয়। কাজ যিনিই করুন, লগইন আপনার কাছে থাকলে পরে কাউকে চেঞ্জ করতে চাইলে কোনো ঝামেলা হয় না। এটা ভরসার প্রশ্ন নয়, সাধারণ সাবধানতা।

খরচ কিসের উপর নির্ভর করে

এখানে কোনো দাম লিখছি না, কারণ দাম কোম্পানি আর অফার অনুযায়ী চেঞ্জ হয়। তবে কোন জিনিসগুলো খরচ ঠিক করে, সেটা জেনে রাখুন:

ডোমেইনের ক্ষেত্রে:

  • কোন এক্সটেনশন (.com, .in, .co.in বা অন্য কিছু)।
  • কত বছরের জন্য নিচ্ছেন।
  • প্রথম বছরের অফার আর রিনিউয়ের দাম আলাদা হতে পারে — রিনিউয়ের দামটা আগে দেখে নিন।

হোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে:

  • কী ধরনের হোস্টিং (শেয়ার্ড, VPS, ম্যানেজড)।
  • কতগুলো সাইট, কত স্টোরেজ, কতটা ভিজিটর সামলাতে হবে।
  • ব্যাকআপ, SSL (সাইটের https), ইমেল আর সাপোর্ট সঙ্গে আছে কিনা।

হোস্টিং বাছার আগে এই প্রশ্নগুলো করুন

যেখান থেকেই নিন, এই চেকলিস্টটা মিলিয়ে নিন। ব্যবসার সাইটের জন্য সাজেশন চাইলে dronahost.com দেখতে পারেন — ওখানে ক্লাউড, WordPress আর ম্যানেজড VPS হোস্টিং আছে, SSL, ইমেল আর ব্যাকআপ সঙ্গেই থাকে।

  1. সার্ভার ভারতের কাছাকাছি কোথাও আছে কি? কাছে থাকলে আপনার কাস্টমারের কাছে সাইট সাধারণত তাড়াতাড়ি খোলে।
  2. SSL দেওয়া আছে কি, যাতে সাইট https-এ খোলে?
  3. অটোমেটিক ব্যাকআপ হয়? ফেরত আনা সহজ?
  4. প্রবলেম হলে সাপোর্টে সহজে কথা বলা যায়?
  5. পরে প্ল্যান বাড়ানো বা অন্য জায়গায় সরে যাওয়া সহজ?
  6. রিনিউয়ের সময় কী শর্ত, আগে থেকে পরিষ্কার লেখা আছে?

রিনিউ ভুলে যাবেন না: ছোট চেকলিস্ট

  • ডোমেইন আর হোস্টিং দুটোর অ্যাকাউন্টে এমন ইমেল দিন, যেটা আপনি রোজ দেখেন।
  • অটো-রিনিউ চালু রাখার কথা ভাবুন।
  • এক্সপায়ারি ডেট ফোনের ক্যালেন্ডারে লিখে রাখুন, এক মাস আগের রিমাইন্ডার দিয়ে।
  • লগইন ডিটেলস সেফ জায়গায় রাখুন, আর কাকে কাকে দেওয়া আছে মনে রাখুন।

যে ভুলগুলো পরে ঝামেলা বাড়ায়

ওয়েবসাইট বানানোর সময় এগুলো ছোট মনে হয়, কিন্তু কয়েক বছর পরে বড় প্রবলেম হয়ে দাঁড়ায়:

  • ডোমেইন অন্যের নামে। ডেভেলপার, ভাইপো বা পুরনো স্টাফের অ্যাকাউন্টে ডোমেইন থাকলে, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে নিজের ঠিকানাই ফেরত পেতে কষ্ট হয়।
  • শুধু প্রথম বছরের অফার দেখে কেনা। পরের বছর রিনিউয়ের সময় শর্ত বা দাম আলাদা হতে পারে। আগে পুরোটা পড়ে নিন।
  • ফ্রি সাবডোমেইনে ব্যবসার সাইট। কোনো ফ্রি প্ল্যাটফর্মের নাম জোড়া ঠিকানা (যেমন yourshop.example.com) মনে রাখা কঠিন, আর দেখতে কম প্রফেশনাল লাগে। নিজের ডোমেইন থাকলে কাস্টমার বেশি ভরসা পান।
  • ইমেল কোথায় আছে না জানা। ব্যবসার ইমেল যদি হোস্টিংয়েই চলে, হোস্টিং বন্ধ হলে ইমেলও বন্ধ। কোথায় আছে, জেনে রাখুন।
  • ঘন ঘন ডোমেইন চেঞ্জ করা। নতুন ডোমেইন মানে নতুন ঠিকানা। লিফলেট, বোর্ড, Google প্রোফাইল, সব জায়গায় চেঞ্জ করতে হয়, আর Google-কেও নতুন করে চিনতে সময় লাগে।

ডোমেইন আর হোস্টিং ছাড়া আর কী লাগে

অনেকে ভাবেন ডোমেইন আর হোস্টিং কিনলেই সাইট রেডি। আসলে আরও কয়েকটা জিনিস লাগে:

  • সাইটটা বানানো — ডিজাইন, পেজ, মোবাইলে ঠিকমতো দেখানো।
  • লেখা আর ছবি — আপনার ব্যবসার আসল ডিটেলস, আসল ছবি।
  • দেখভাল — আপডেট, ব্যাকআপ, মাঝে মাঝে নতুন ইনফো বসানো।

ডোমেইন আর হোস্টিং হল ভিত। তার উপর বাড়িটা তুলতে হয়।

শেষ কথা

ডোমেইন আপনার ঠিকানা, হোস্টিং আপনার দোকানঘর, আর ওয়েবসাইট হল ভেতরের সাজানো দোকান। এই তিনটে বুঝে গেলে ডেভেলপারের সঙ্গে কথা বলা অনেক সহজ হয়ে যায়।

সাইট বানানোর পুরো রাস্তাটা স্টেপ বাই স্টেপ দেখতে চাইলে পড়ুন ব্যবসার ওয়েবসাইট কিভাবে বানাবেন। আর ওয়েবসাইট কেন দরকার, সেই আলোচনা আছে ব্যবসার জন্য ওয়েবসাইট কেন দরকার লেখায়।

যোগাযোগ করুন — WhatsApp-এ আপনার ব্যবসার কথা জানান। কেমন ওয়েবসাইট মানাবে, কোন ডোমেইন আর হোস্টিং লাগবে, ফ্রি-তে সাজেশন দেব।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

ডোমেইন কি একবার কিনলেই সারাজীবনের জন্য আমার?

না। ডোমেইন আসলে একটা স্পষ্ট সময়ের জন্য রেজিস্টার করা হয় — এক বছর বা তার বেশি। সময় শেষ হওয়ার আগে রিনিউ করতে হয়। রিনিউ না করলে কিছুদিন পর সাইট আর ইমেল বন্ধ হয়ে যায়, আর আরও পরে ডোমেইনটা অন্য কেউ নিয়ে নিতে পারেন।

Domain আর hosting কি একই জায়গা থেকে নিতে হয়?

না, আলাদা আলাদা জায়গা থেকেও নেওয়া যায়। তখন ডোমেইনের সেটিংসে (DNS বা নেমসার্ভার) হোস্টিংয়ের ঠিকানা বসিয়ে দুটো জুড়ে দিতে হয়। এক জায়গায় রাখলে সামলানো একটু সহজ, আলাদা রাখলে পরে হোস্টিং চেঞ্জ করা সহজ — দুটোরই বেনিফিট আছে।

শুধু ডোমেইন কিনে রাখলে কি ওয়েবসাইট হয়ে যায়?

না। ডোমেইন শুধু ঠিকানা। সাইটের ফাইল রাখার জন্য হোস্টিং লাগে, আর সাইটটা বানাতেও হয়। তবে পছন্দের নাম হাতছাড়া হওয়ার ভয় থাকলে আগে শুধু ডোমেইন রেজিস্টার করে রাখা যায়।

হোস্টিং চেঞ্জ করলে কি ডোমেইনও চেঞ্জ করতে হয়?

না। ডোমেইন একই থাকে, শুধু সেটা কোন সার্ভারের দিকে দেখাবে সেটা চেঞ্জ করতে হয়। কাস্টমার একই ঠিকানা টাইপ করবেন, সাইট খুলবে নতুন জায়গা থেকে। এই কারণেই ডোমেইন সব সময় নিজের হাতে রাখা জরুরি।

ব্যবসার জন্য .in ভালো, না .com?

দুটোই চলে। কাস্টমার যদি মূলত ভারতের, বিশেষ করে আপনার এলাকার হন, .in বা .co.in দেখে বোঝা যায় ব্যবসাটা ভারতের। .com সবার চেনা, মনে রাখাও সহজ। পছন্দের নামটা যেটায় পাওয়া যায় আর যেটা বলতে-লিখতে সহজ, সেটাই নিন। সম্ভব হলে দুটোই নিয়ে একটাকে অন্যটায় রিডাইরেক্ট করে দেওয়া যায়।

সর্বশেষ আপডেট:

#ওয়েবসাইট #লোকাল ব্যবসা

WhatsApp